যে ঘড়ি ফ্যাশনের

মুঠোফোনের কল্যাণে সময় দেখতে হাতঘড়ির প্রয়োজন কমলেও চাহিদা শেষ হয়ে যায়নি। এখন ফ্যাশন ও প্রয়োজন—দুটোই মেটায় ঘড়ি। হাতঘড়ির ফ্যাশন ট্রেন্ড নিয়ে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

যা চলছে
আমাদের দেশের আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ বলে ঘাম বেশি হয়। তাই চেইনের ঘড়ি বেশি চলে।
******
ক্রনোগ্রাফ ঘড়িগুলোর চাহিদা বেশি। এই ঘড়িতে ছয়টা কাঁটা। এটা সময়, দিন, তারিখ দেখানোর পাশাপাশি স্টপ ওয়াচের কাজও করে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় ইচ্ছামতো সময় সেট করা যায়।

যা নতুন
শুধু সময় দেখা নয়, স্মার্টওয়াচ দিয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী নিজের ফোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। স্লিপ কোয়ালিটি এবং ফিটনেস ট্র্যাক করা যাবে সহজেই। ক্যামেরা ও মিউজিক নিয়ন্ত্রণসহ ফোন করা যাবে। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নোটিফিকেশন দেখতে পারবেন।
শুধু সময় দেখা নয়, এখন ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়েছে হাতঘড়ি।

নকশা ও আঙ্গিকেও এসেছে নানা পরিবর্তন। ডায়াল থেকে শুরু করে বেল্টের রংও পাল্টে গেছে। নব্বই দশকের মত সরু বেল্টের মধ্যেই সীমিত নেই হাতঘড়ির বাজার। সব বয়সী ও পেশার মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজারে এসেছে বিভিন্ন ধরনের হাতঘড়ি। হাতঘড়িতেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। সময়ের পাশাপাশি দিন, তারিখও  দেখাচ্ছে হাতঘড়ি। কম্পাসের সাহায্যে দিচ্ছে দিকনির্দেশনা। স্টপ ওয়াচের কাজও করছে। কিছু ঘড়িতে ব্যবহারকারীর অবস্থান শনাক্ত করতে রয়েছে জিপিএস সুবিধা। আবার কিছু ঘড়িতে ক্যালেন্ডার ও রিমাইন্ডার অপশন থাকে, যেগুলো আপনার প্রতিদিনের শিডিউলকে আরো সহজ করে দেয়। ব্যাটারিচালিত ঘড়ি তো আছেই। পাশাপাশি হাতের মুভমেন্টের ওপর চলে এমন ঘড়িও আছে। সৌরশক্তিতে চলা ঘড়িও পাবেন। এ ছাড়া যুগলদের জন্য রয়েছে একই ডিজাইনের কাপল ঘড়ি। বাচ্চাদের জন্য আছে কিডস ঘড়ি।

সাকো ওয়াচের জেনারেল ম্যানেজার লুত্ফর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যেই ঘড়ি পরার প্রবণতা বেশি। ইউরোপে ঠাণ্ডার কারণে লেদারের বেল্ট বেশি ব্যবহূত হয়। আর আমাদের দেশের আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ বলে ঘাম বেশি হয়। তাই চেইনের ঘড়ি বেশি চলে। চেইন মূলত সাদা ও কালো রঙের হয়। এ ছাড়া সোনালি কিংবা সাদা ও কালোর সমন্বয়ে তৈরি চেইনও পাবেন। ’ টাইম ভিউয়ের কর্নধার মো. স্বপন ইসলাম বলেন,‘ট্রাডিশনাল ঘড়ির পাশাপাশি আমাদের এখানে ক্রনোগ্রাফ ঘড়িগুলোই বেশি চলে। সাধারণ ঘড়িতে তিনটা কাঁটা থাকে। কিন্তু ক্রনোগ্রাফ ঘড়িতে ছয়টা কাঁটা। এটা সময়, দিন, তারিখ দেখানোর পাশাপাশি স্টপ ওয়াচের কাজও করে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় ইচ্ছামতো সময় সেট করা যায়। ফলে এটা সাঁতারু, অ্যাথলেট কিংবা পর্বতারোহীদের দারুণ কাজে দেয়। কিছু ঘড়িতে আবার স্টপ ওয়াচের পাশাপাশি একই সঙ্গে তিন থেকে চারটা দেশের সময় দেখা যায়। ’

চেইন ও বেল্টেও লেগেছে নানা রঙের ছোঁয়া। চামড়ার তৈরি বেল্ট যেমন আছে, তেমনি আছে রাবার, রেক্সিন ও জিনসের বেল্টও। সরু, মাঝারি ও চওড়া—তিন রকমের বেল্ট ও চেইনওয়ালা হাতঘড়ি পাবেন। কালো রঙের বেল্টের পাশাপাশি বাদামি, লাল, হালকা সবুজ, হালকা গোলাপি কিংবা ধূসর রঙের হাতঘড়ির বেল্ট মিলছে। বেল্ট কিংবা চেইনে বিভিন্ন ধরনের পাথর, ক্রিস্টাল বসানো মেয়েদের হাতঘড়ি পাওয়া যাচ্ছে। বেল্টের ওপর দিয়ে ঝোলানো চেইন, রিবন প্যাঁচানো বেল্টের ঘড়িও চলছে। বায়তুল মোকাররম মার্কেটের টাইম প্লেসের ম্যানেজার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘বড় ডায়ালের হাতঘড়ি এখন তরুণ-তরুণীরা বেশ পছন্দ করছেন। স্টোন বসানো ব্রেসলেট নকশার ঘড়িও রয়েছে তরুণীদের পছন্দের তালিকায়। ’  ছেলেদের কাছে চেইনওয়ালা হাতঘড়ি আর চওড়া বেল্টের হাতঘড়ি মেয়েদের বেশি পছন্দ বলে জানালেন, নিউ মার্কেটে টাইম ওয়ার্ল্ডের বিক্রেতা জহিরুল ইসলাম। তিনি আরো বললেন, ‘অনেক তরুণ স্পোর্টস ঘড়ি পরতেও পছন্দ করেন। এসব ঘড়িতে সময় দেখার পাশাপাশি দিকনির্দেশনা, তাপমাত্রা জানাসহ স্টপ ওয়াচের সুবিধা থাকে। ’

ডায়ালেও পরিবর্তন
ঘড়ির ডায়ালেও এসেছে পরিবর্তন। গোলাকার ঘড়ি তো রয়েছেই। চৌকোনা, ত্রিভুজ, আয়তকার আকারেও হয় হাতঘড়ি। সাদা-কালোর পাশাপাশি সোনালি, হালকা গোলাপি, হালকা সবুজ, হলুদ বিভিন্ন রঙের ডায়ালও পাবেন। নানা রঙের ছোট ছোট পাথর ও ধাতুর আকর্ষণীয় কারুকাজ থাকছে এসব ডায়ালের ভেতরে-বাইরে। কিছু ঘড়ি আছে দেখতে ব্রেসলেটের মতো। কিছু ঘড়ি আবার ডায়ালসহ দুই পাশে পুরো চেইনের ওপরও পাথর বসানো। ঘণ্টা ও মিনিটের কাঁটাযুক্ত ডায়াল যেমন আছে, তেমনি কোনো ডায়ালে রয়েছে তিনটি কাঁটা। সেকেন্ডের খবরটাও যেন জানান দেওয়া চাই দ্রুত। তবে দুই কাঁটাসমেত বড় ডায়ালের হাতঘড়ি ও অনেকে কিনছে। রাজধানীর নিউ মার্কেটের দ্য ডায়মন্ড ওয়াচের বিক্রেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘মাঝবয়সী নারীরা পছন্দ করছেন মাঝারি ও ছোট আকৃতির ডায়াল। কর্মজীবী পুরুষরা আবার চেনওয়ালা বড় ডায়েলের ঘড়ি বেশি কিনছেন। ’

যেমন পোশাক তেমন ঘড়ি
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিহা নেহাল। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি বা আড্ডা আর অফিসের পরিবেশ তো এক নয়। তাই একেক সময় একেক পোশাক বেছে নিতে হয়। সে অনুযায়ী বদলে নিই হাতের ঘড়িটিও। ’ মডেল ও অভিনেত্রী নাবিলা ইসলাম বলেন, ‘হাতঘড়ি আমার খুবই পছন্দের। ঘড়ির সংগ্রহও মন্দ না। এখন বড় ডায়াল আর চওড়া বেল্টের ঘড়িই বেশি পরা হয়। পশ্চিমা পোশাকের সঙ্গে বড় ডায়াল ও চওড়া বেল্টের ঘড়ি পরি। আর ফরমাল পোশাকের সঙ্গে একটু চিকন বেল্টের ঘড়িতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ’
একেক ধরনের পোশাকের সঙ্গে একেক রকম ঘড়ি মানানসই। সময় ও পরিবেশ বুঝে পরার জন্য ক্যাজুয়াল, ফরমাল ও এক্সক্লুসিভ—তিন ধরনের ঘড়ি রাখতে পারেন সংগ্রহে। ফ্যাশন ডিজাইনার শায়লা নূর বলেন, ‘পোশাকের সঙ্গে ঘড়ির ব্যাপারটা আসলে পুরোটাই নির্ভর করে নিজের ব্যক্তিত্বের ওপর। আপনাকে কোন ধরনের পোশাকে ভালো লাগছে, সেটা আগে বুঝতে হবে। তার ওপর ভিত্তি করেই হাতঘড়ি বাছাই করে নিতে হবে। চওড়া বেল্টের হাতঘড়ির প্রচলন বেশি বলেই যে এ ধরনের ঘড়ি পরতে হবে তা কিন্তু নয়। সবার আগে দেখতে হবে যে ঘড়িটা আপনি পরছেন, সেটা ভালো দেখাচ্ছে কি না কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন কি না। ’
ক্যাজুয়াল লুকের ক্ষেত্রে চেইন আর বড় ডায়ালের ঘড়িই বেশি জনপ্রিয়। আর অফিসে ফরমাল লুকের জন্য ছোট বা মাঝারি ডায়ালের চামড়া বা চিকন চেইনের ঘড়ি মানাবে। ছোট ডায়ালের হাতঘড়ি পরে অনুষ্ঠান বা দাওয়াতেও যেতে পারেন। শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যাবে এ ধরনের ঘড়ি। পাশ্চাত্য ঘরানার টপ, গাউন কিংবা ফতুয়ার সঙ্গে বড় ডায়াল ও চওড়া বেল্টের হাতঘড়ি পরতে পারেন।

কোথায় পাবেন
বাংলাদেশে হাতঘড়ির বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোই ভরসা। দেশে হাতঘড়ি আমদানিকারকদের মধ্যে টাইম জোন, টাইম ভিউ, সাকো ওয়াচ, ওয়াচেস ওয়ার্ল্ড প্রভৃতি অন্যতম। নারী ও পুরুষ সব ধরনের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফরমাল ও ক্যাজুয়াল ঘড়ি পাওয়া যাবে এদের শোরুমগুলোতে। এসব ব্যান্ডের মধ্যে ক্রিডেন্স, টিসট, ক্যাসিও, মন্ট্রেক্স, টাইটান, ফাস্ট ট্র্যাক, ওমেগা, গুচি, সিকো, এমিকা, ফসিল, ডিজেল, সুইস্টার, লোবর, ভিকটোরি নক্স, বারবারি, রয়েল ক্রাউন, রোলেক্স, রাডো ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন রঙের হাতঘড়ি পাবেন বসুন্ধরা সিটি, গুলশান ডিসিসি মার্কেট, রাপা প্লাজা, সীমান্ত স্কয়ার, যমুনা ফিউচার পার্কসহ বিভিন্ন শপিং মলে। নিউ মার্কেট কিংবা বায়তুল মোকাররম মার্কেটেও পাবেন। এখন দারাজ ডটকম, আজকের ডিল, বিডিশপ, প্রিয়শপসহ অনলাইনের বিভিন্ন দোকানও থেকে বেছে নিতে পারেন পছন্দের হাতঘড়িটি।

কেমন দাম
টাইম ভিউয়ের কর্ণধার মো. স্বপন ইসলাম বলেন, ‘ঘড়ির দাম নির্ভর করে মান ও ব্র্যান্ডের ওপর। তা ছাড়া কোন দেশ থেকে উত্পাদিত সেটার ওপরও দাম নির্ভর করে। ব্র্যান্ডের ঘড়িগুলোতে ওয়ারেন্টি সুবিধাও রয়েছে। যেমন ‘মেইড ইন সুইজারল্যান্ড’ ঘড়িগুলোর দাম ২০০০০ থেকে শুরু করে লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর জাপান, চীন প্রভৃতি দেশ থেকে আসা ব্র্যান্ডের ঘড়ির দাম সাড়ে ৫৫০০ থেকে শুরু। নন-ব্র্যান্ড কালারফুল রাবার, চেইন ও কাপড়ের বেল্টের বিভিন্ন ঘড়ি পাবেন ২৮০ থেকে ২৫০০ টাকায়।

খেয়াল করুন
** হাতঘড়ি কেনার সময় নির্দিষ্ট ফিচার ও সুবিধাগুলোর দিকেও খেয়াল রাখুন। কত দিনের ওয়ারেন্টি সুবিধা রয়েছে, ব্যাটারি ঠিকমতো চলছে কি না, পানি প্রতিরোধক কি না তা দেখে নিন।

** ওয়ারেন্টি কার্ডটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করুন।

** ওয়াটারপ্রুফ না হলে বর্ষা মৌসুমে হাতঘড়ি ব্যবহারে একটু সাবধান হওয়া ভালো।

কমেন্টসমুহ
সিক্রেট ডাইরি সিক্রেট ডাইরি

Top