এইচএসসি ২০১৮: এক দুঃস্বপ্নের নাম

দশ বছরের স্কুল জীবন শেষ করে প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী তাদের কলেজ জীবনে পা রাখে। এই কলেজ জীবন খুব সীমিত সময়ের হয়ে থাকে, কেবল দু’বছর। ঠিক দু’বছর বলাটা ঠিক হবে না। জুলাই মাস থেকে শুরু হয় প্রায় সব কলেজ। এরপর এক বছর এবং তারপর আরেক বছরও সময় থাকে না। এপ্রিল মাসে শুরু হয় হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট বা এইচএসসি পরীক্ষা। এটা শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলেই ধারণা করা হয় এবং এর উপর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। জীবনের স্বপ্নও একে ঘিরেই তৈরি হয় অনেকটা।

দু’বছর বা যা দেড় বছর বললেই চলে, এরকম খুব অল্প সময়ে এই এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া হয়। অথচ এর ফলাফলের উপর শিক্ষার্থীদের পরের শিক্ষাজীবন নির্ভরশীল। অপর দিকে দুবছরের বেশি সময় নিয়ে নবম ও দশম শ্রেণিতে প্রতিটা বিষয়ে কেবল একটি করে পত্রের ছোটখাটো বই পড়ে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষা দিতে বসে শিক্ষার্থীরা। উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষার জন্য দেড় বছরে প্রতিটা বিষয়ের দুটি করে পত্র রাখা আছে যেখানে বইয়ের আকারও মোটাসোটা। শিক্ষার্থীদের জন্য এই পুরো বিষয়টি কতটুকু ন্যায্য তা নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন থেকে যায়।

প্রতি বছরের মতো এবার ২০১৮ সালেও এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বসেছিলো লাখো শিক্ষার্থী। প্রতিবছরই প্রশ্নফাঁস নামক একটি কঠিন সমস্যা নিয়ে প্রচুর কথা হয়। শত চেষ্টা ও কঠোর নিরাপত্তার পরও কোন বছর, কোনো পরীক্ষাতেই এই প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে সক্ষম হয়নি আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। এপ্রিলের এইচএসসি পরীক্ষার আগে বছরের প্রথমে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসি পরীক্ষা হয়ে থাকে। এবারও হয়েছে এবং প্রতিবারের মত এবারও অতি কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এসএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে চরম নিন্দার মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে এবারের এইচএএসসি পরীক্ষাতে আরো বেশি কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয় প্রশ্নফাঁস রোধ করতে। কিন্তু এর সাথে এমন কিছু নিয়ম এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় যা অতীতে এইচএসসি পরীক্ষার ইতিহাসে দেখা গেছে কিনা সন্দেহ।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষার রুটিনটি সবচেয়ে বড় অবাক করা বিষয় ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য। প্রথমেই বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষা স্বাভাবিক, কিন্তু এর পরদিনই বাংলা ২য় পত্র পরীক্ষা দেয়া হয় রুটিনে। মনে রাখতে হবে যে এখন বাংলায় তাদের ৭টি করে সৃজনশীল দিতে হচ্ছে। আর ঠিক তার পরেরদিনই বাংলা ২য় পত্রের মত বিষয়টি রাখা তাদের উপর কতটা ঠিক, সে প্রশ্ন রয়েই গেল!

তারপর একদিন ছুটি দিয়ে দিয়ে ইংরেজি ১ম ও দুদিন ছুটি দিয়ে ইংরেজি ২য় পত্র পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা। এটা মানানসই ধরা যায়। এরপর আসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা সংক্ষেপে আইসিটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষাটি কেবল একদিন বিরতির পরই দেয় শিক্ষার্থীরা। এখানে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি হলো, বাংলাদেশে আইসিটি বিষয়টি চালু করার পর থেকে এই বিষয়টিতেই শিক্ষার্থীদের ফেলের সংখ্যা সর্বাধিক। আর দ্বিতীয়টি হলো, ২০১৮ সালের যে ব্যাচ এই বিষয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে তারা নবম দশম শ্রেণিতে আইসিটি বিষয়টি পড়ে আসেনি, যেখানে এখন ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আইসিটি একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। মোটকথা আইসিটি বিষয়টি এমনিতেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কঠিন বিষয়, সে জায়গায় কেবল একদিন বিরতি অনেকের জন্যই খুব চাপ হয়ে হচ্ছিল।

সেখানেই কথা শেষ নয়। ব্যাপারটা যদি কেবল কম ছুটি বা বিরতির বিষয় হতো তাহলেও হয়তোবা ঠিক ছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলে ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা যে প্রশ্ন পায় তা দেখে তাদের ভালো রেজাল্টের আশা তো দূরে থাক, পাশ করা নিয়েও ভাবতে হয়েছে। বিশেষ করে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের ভয়াবহতা দেখে অনেক শিক্ষার্থীই চোখের জল ফেলতে ফেলতে হল থেকে বের হয়েছিল।

এরপর বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষাসমুহ। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা এবং মানবিক শাখার বিষয়গুলোর পরীক্ষার পালা আসে।

এখন বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার রুটিন বলতে গেলে সবচেয়ে প্রথমে যা সামনে আসে তা হলো যাদের পরিসংখ্যান আছে তাদের প্রতি হওয়া সহজ ভাষায় যাকে অত্যাচার বলা হয় তাই। আইসিটি পরীক্ষার ঠিক পরের দিন পরিসংখ্যান ১ম পত্র এবং তার ঠিক পরেরদিন পরিসংখ্যান ২য় পত্র পরীক্ষা। আবার অ্যাকাউন্টিং ১ম এবং ২য় পত্রও পরপর দিতে হয় শিক্ষার্থীদের।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এবার আসা যাক বিজ্ঞান বিভাগের রুটিন এবং তারচেয়েও বেশি আলোচিত তাদের প্রশ্নপত্র নিয়ে। বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থ বিজ্ঞান ১ম পত্রের আগে ২দিন এবং ২য় পত্রের আগে কেবল একদিন বিরতি ঠিক করা হয়। এখন বিষয়টি হল, বিজ্ঞান বিষয়টিই খুব জটিল। খুব কষ্ট করে কেবল দেড় বছরের প্রস্তুতিতে পরীক্ষা দিতে বসে শিক্ষার্থীরা। পদার্থ বিজ্ঞানের মত এই জটিল বিষয়ের দুটি পত্র যা পড়ে এসেছে তা দেখে যাওয়ার জন্য এটুকু সময় কখনোই যথেষ্ট নয়। তবে এক্ষেত্রেও কেবল যদি বিরতির ব্যাপারটা একমাত্র ইস্যু হতো তাহলে সেটা কোন সমস্যা নাও বিবেচনা করা যায়। শিক্ষার্থীদের যদি প্রস্তুতি ভাল হয়ে থাকে তাহলে এটা কোন সমস্যা না। কারণ মূল সমস্যা ছিল পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্ন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে লেখার শেষ ছিল না। প্রথমত দুটি প্রশ্ন প্রমাণিত ভাবে দেখা গেছে যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন থেকে নেয়া। এখন ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন থেকে নেয়ার ব্যাপারটার পক্ষ নেয়া যেতেই পারে, তবে কথা হলো এই শিক্ষার্থীদের অতি সীমিত সময়ের মাঝে এতগুলো বিষয়ের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ নম্বর বা অন্তত ৮০ নম্বর পাওয়ার আশা করা হয়। আর সে কারণেই একটি প্যাটার্নে তারা প্রস্তুতি নেয় ভালো করার। শিক্ষকেরা বলে দেন কোন কোন বিষয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এরকম প্যাটার্ন অনুসরণ করা হয় বলেই বিগত কয়েক বছর যাবত জিপিএ ৫ এর সংখ্যা এত বেশি হচ্ছে এবং বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে। সেকারণে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন তুলে দেয়া তাদের প্রতি কি অবিচার হলো কিনা সে প্রশ্নটা রেখে গেলাম।

কেবল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ছাড়াও এবারের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্ন ঠিক কতটা কঠিন হয়েছে তার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোই। এমনকি বুয়েটের একটি ছাত্র নিজ উদ্যোগে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন সমাধান করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেয় এবং বলে যে প্রশ্ন আসলেই এতটা কঠিন হয়েছে যে তার নিজের জন্যও এই প্রশ্নের সমাধান কষ্টসাধ্য ছিল। তার সাথে অনেক বুয়েট এবং অন্যান্য স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এটা স্বীকার করেছে যে এইচএসসি’র জন্য এ প্রশ্ন আসলেই কঠিন ছিল এবং শিক্ষার্থীদের জন্য এক কথায় অন্যায় হয়েছে।

আবার উচ্চতর গণিত বিষয়েও ঠিক একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় শিক্ষার্থীদের। কেবল একদিন বিরতি ১ম পত্রের আগে এবং দুদিন ২য় পত্রের আগে।

এই রুটিনের কারণ হিসেবে যা বলা হয় তা হলো দ্রুত পরীক্ষা শেষ করা। হ্যাঁ। ৩রা মের মধ্যে এইচএসসি ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষা শেষ করে দেয়া হয়। কিন্তু অপর দিকে মানবিক বিভাগের পরীক্ষা বিভিন্ন কারণে ১৪ তারিখ পর্যন্ত নেয়া হয়। তাহলে কেন বিজ্ঞান ও ব্যবসায়ী শিক্ষার পরীক্ষাগুলো এত দ্রুত শেষ করে দেয়া হল? যদি তাদেরও পরীক্ষাগুলো একটু পিছিয়ে দিয়ে নেয়া হতো তাহলে হয়তো শিক্ষার্থীরা এত কঠিন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হওয়ার জন্য কিছুটা হলেও প্রস্তুত থাকতে পারতো।

তবে এ সকল ব্যাপারের মধ্যে যে বিষয়টি একমাত্র ইতিবাচক ছিল তা হলো এ বছর কোনো বিষয়েরই প্রশ্ন ফাঁস হয়নি।

সব কথার মুল কারণ যদি প্রশ্নফাঁস রোধ করা ও প্রকৃত মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাই যেন ভালো ফলাফল করে অর্থাৎ প্রকৃত মেধার সন্ধানই যদি এর উদ্দেশ্য হয় তাহলে কোন দুঃখ নেই। আমরা সকলেই তো সেটাই চাই যে দেশে প্রকৃত মেধারই বিকাশ হোক। তবেই তো এদেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেবলমাত্র এ বছরের জন্য এরকম কড়া নিয়ম শৃঙ্খলা পালন করা হয়ে থাকে তাহলে এ বছরের এই শিক্ষার্থীদের জন্য তা কি ন্যায্য হলো? বিরতি ছাড়া পরীক্ষা ও কঠিন প্রশ্নপত্রের কারণে অনেকের স্বপ্ন কি ভেঙে গেল না পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে? তাদের তো এই বছরের এই পরীক্ষার ফলাফলপত্র নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা এরপর চাকরি বা অন্যান্য পেশায় যেতে হবে। পরের বছর যদি এরকম কঠিন প্রশ্ন না হয় তাহলে ফলাফল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেটা কতটা সঠিক হবে? তখন এই বছরের শিক্ষার্থীরা কি পিছিয়ে যাবে না?

প্রতিবছর শিক্ষাবোর্ড থেকে কোন নতুন নিয়ম চালু করা হয়। কখনো সৃজনশীল নিয়ম (যাতে কতটা সৃজনশীলতা প্রকাশ পায় সে প্রশ্ন রইল), এরপর সকল বিষয়ের সাথে গণিতেও সৃজনশীল প্রশ্নের নিয়ম। একসময় শিক্ষার্থীর চতুর্থ বিষয় বা ফোর্থ সাবজেক্ট এর নম্বর মোট নম্বর এর সাথে যোগ করা হতো না। যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্পের জন্য চান্স পায়নি। তার ঠিক পরের বছর থেকে আবার এই ফোর্থ সাবজেক্ট নম্বর যোগ করার নিয়ম চালু হলো। এটা কি আগের বছরের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যায় হলো না?

এভাবে বোর্ড থেকে প্রায়শই নতুন নিয়ম চালু হয়, এরপর আবার তা বন্ধও করে দেয়া হয়। এভাবেই চলতে থাকে। খালি মাঝখান দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা দুর্ভোগের শিকার হয়। এখন কেবল এটাই আশা যে এবারের মত আগামী সবকটা বছরের ঠিক একই রকম নিয়ম পালিত হবে এবং এ বছরের শিক্ষার্থীদের স্বপ্নগুলো আস্ত থাকবে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Most searched keywords: Insurance, Loans, Mortgage, Attorney, Credit, Lawyer, Donate, Degree, Hosting, Claim, Conference Call, Trading, Software, Recovery, Transfer, Gas/Electricity, Classes, Rehab, Treatment, Cord Blood, domain, music, mobile, phone, buy, sell, classifieds,recipes
Top
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com