নিজের গাড়ি বিক্রি করে সিনেমা শেষ করেছি: আশরাফ শিশির

পত্রিকা কিংবা অনলাইন নয়, সংবাদপত্র খুললেই বিনোদন পাতায় প্রায়শই চোখে পড়ে ভিনদেশি চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশি ছবি ‘গাড়িওয়ালা’র প্রদর্শন কিংবা পুরস্কার জয়ের খবর। কথা হলো সেই গাড়িওয়ালা আশরাফ শিশিরের সাথে, জানা গেলো আর্থিক অনটনের মধ্যেও কিভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করেছেন সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এই ছবি। তার লড়াকু মনোভাবের ফসল আজ তিনি পাচ্ছেন, এরই মধ্যে প্রায় ৩৬টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ঘুরে এসেছে তরুণ মেধাবী এই নির্মাতার চলচ্চিত্র ‘গাড়িওয়ালা’…

একটা চলচ্চিত্র একজন নির্মাতার দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। চলচ্চিত্র মানেই শুধু একটা গল্পকে কেন্দ্র করে কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রীর আবর্তন নয়, মনভোলানো চমকপ্রদ দৃশ্যের গাঁথুনিও নয় বোধয়। সিনেমার প্রতিটা দৃশ্যে গেঁথে থাকে একজন নির্মাতার স্বপ্নের বয়ান। কিংবা আরো বেশী কিছু। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ নির্মাতা আশরাফ শিশিরের ‘গাড়িওয়ালা’ তেমনি এক স্বপ্নের বয়ান। অন্তত স্বপ্নগ্রস্ত এই নির্মাতার কাছে।

বেশ কিছুদিন আগে নির্মাতা আশরাফ শিশিরের সাথে কথা হয়েছিলো তার চলচ্চিত্র যাত্রা এবং নির্মাণ নিয়ে। এরই মধ্যে তার চলচ্চিত্র ‘গাড়িওয়ালা’ ঘুরে এসেছে অন্তত ৩৬টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।

সাম্প্রতিক সময়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ছবি আশরাফ শিশিরের ‘গাড়িওয়ালা’। নানান সময়ে চলচ্চিত্রটির বদৌলতে ভিনদেশেও আওড়ানো হচ্ছে বাংলাদেশের নাম। হোক সেসব চলচ্চিত্র উৎসবগুলো অখ্যাত, তারপরওতো ছবিটির নামের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নামটি।

‘গাড়িওয়ালা’ ছবির একটি দৃশ্য…

সরকারের অর্থায়নে একটি চলচ্চিত্র ‘গাড়িওয়ালা’। বাংলাদেশে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমার জন্য যে অর্থ বরাদ্ধ থাকে তা এই সময়ে এসে একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমার জন্য যথেষ্ট তো নয়ই, বরং এটা একটি কমপ্লিট সিনেমা বানাতে হাস্যকর বাজেটও বটে। ফলে যে সমস্যাটি হয়, দেশের বেশীরভাগ অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না। লিস্ট চেক করলে দেখা যাবে, এ যাবৎকালের অর্ধেকের বেশী অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র হয়ত নির্মিতই হয়নি বা এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কাছে নেই।

এ সম্পর্কে নির্মাতা আশরাফ শিশির বলেন, ‘আমি ১০ লাখ টাকা অনুদানপ্রাপ্তির পর নিজের সবকিছু বিক্রি করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘গাড়িওয়ালা’ নির্মাণ করেছি, বাংলাদেশের আর কোন অনুদানের চলচ্চিত্র বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে পুরোপুরি নির্মাণ করে জমা দেওয়া হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’

সিনেমায় যদি বিভাজনের কথা বলি, এবং এই বিভাজনকে ‘মেইনস্ট্রিম’ আর ‘আর্টফর্ম’ বলে ভাগ করি তাহলে দেখা যাবে এই দুইশ্রেনেীর মানুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক একটা সংঘর্ষ রয়েছে। দুই শ্রেনীর মানুষই পরস্পরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেন। এইভাবেই এক ধরণের সম্পর্কহীনতা তৈরি হয়ে গেছে পরস্পেরের মধ্যে। ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যারা অফট্র্যাৈকের সিনেমা নির্মাণ করেন। কারণ তাদের কাছে সিনেমা হল নেই, তারা প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছানোরই কোনো সুযোগ পান না। মেইনস্ট্রিমের বাহিরে গিয়ে ছবি বানানো যেনো একটা মহা অপরাধ! এমন অপরাধই আশরাফ শিশির করেছেন ‘গাড়িওয়ালা’ বানিয়ে। যদিও এটিকে এখন তিনি নিশ্চয় ‘মহান অপরাধ’ বলে বোধ করে থাকবেন।

‘গাড়িওয়ালা’ টিমের সদস্যদের সাথে আশরাফ শিশির…

‘গাড়িওয়ালা’ বানিয়ে আশরাফ শিশির চেয়েছিলেন প্রথমে বাংলাদেশের দর্শকদের দেখাতে। কিন্তু তিনি চাইলেই কি আর সব সম্ভব! ফলে হলোও তাই, ডিস্ট্রিবিউটর থেকে একবারে হল মালিকদের ধারে ধারে ঘুরেছেন আশরাফ শিশির। কিন্তু কেউ এমন ধীরগতির ছবি মুক্তি দিতে রাজি হলো না। অভিজাত রুচির সিনেপ্লেক্সেও ঘুরেছেন ‘গাড়িওয়ালা’ মুক্তি দিতে; স্টার সিনেপ্লেক্স, যমুনা ব্লকবাস্টার, বলাকা সিনেওয়ার্ল্ডসহ এমন অভিজাত হলগুলোর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছেন তিনি। কিন্তু সবাই মুখে বড় বড় কথা বললেও ‘গাড়িওয়ালা’ সিনেমা হলে চালানোর রিস্ক নিলেন না। আশরাফ শিশির এ সম্পর্কে বলেন, ‘প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি, কাকরাঈলের বক্স অফিস থেকে শুরু করে স্টার সিনেপ্লেক্স, যমুনা ব্লকব্লাস্টার, বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড কোথায় যাই নি আমি! বড় বড় কথা বলে সবাই ‘আমি শুধূ চেয়েছি তোমায়’ জাতীয় তামিল-তেলেগু-হিন্দী নকল ছবির জন্য লকলকে জিহ্বা বের করে রেখেছেন’।

স্ত্রী কবি কাবেরী রায়চৌধুরির সাথে আশরাফ শিশির…

একসময় সিনেমা হলে মুক্তি দেয়ার কথা বাদ দিয়ে দেশব্যাপী তারেক মাসুদের মতো সিনেমা ফেরি করারও চিন্তা করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাতেও কোনো ছোটখাটো স্পন্সর খুঁজে পেলেন না। নিজের একমাত্র সম্বল ‘গাড়ি’টিও ‘গাড়িওয়ালা’ নির্মাণ করতে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। সিনেমা হল না পেয়ে হতাশ কণ্ঠে আশরাফ শিশির বলেন, ‘গাড়িওয়ালা’ নির্মাণ করতে গিয়ে আমি আমার গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছি। প্রচন্ড আর্থিক কষ্টেও টিভিতে বিক্রি করিনি, কারণ, টিভিতে প্রিমিয়ার হয়ে গেলে সারা পৃথিবীতেই সেই ছবিকে টেলিফিল্ম হিসাবে গণ্য করা হয়। নিজের নেটওয়ার্ক দিয়ে সারাদেশে ঘুরে ঘুরে ছবি দেখাতে চেয়েছি, কিন্তু তাতেও কোনো স্পন্সর এগিয়ে আসেনি।’

একসময় হতাশ হয়ে আশরাফ শিশির বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্রটির সেন্সর সার্টিফিকেটটিও এখন তবে ভাঁজ করে ঠোঙা বানানোর সময় এসে গেছে’। যদিও এখন শুনা যাচ্ছে, শীঘ্রই দেশেও মুক্তি দিতে পারেন আন্তর্জাতিকভাবে অসংখ্য পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘গাড়িওয়ালা’।

এক নজরে গাড়িওয়ালা…

‘গাড়িওয়ালা’ দুই ভাই এবং তাদের মায়ের গল্প। গ্রামের মাঠে-নদীতে ভেসে বেড়ানো দুই ভাই, জীবন সংগ্রামে বিপর্যস্ত তাদের মা, তাদের স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ আর জীবনের কষাঘাতে এক রাতে ছোট্ট এক শিশুর সামর্থ পুরুষ হয়ে ওঠার গল্প, তারা প্রচন্ড দারিদ্রের মধ্যে কিভাবে গাড়িওয়ালা হয়ে উঠেছিল সেই গল্পগাঁথার দৃশ্যায়ন করেছেন নির্মাতা আশরাফ শিশির।

৮৬ মিনিট ব্যাপ্তী চলচ্চিত্রটিতে রোকেয়া প্রাচী ও রাইসুল ইসলাম আসাদ ছাড়াও অভিনয় করেছেন মাসুম আজিজ, সুপার হিরো সুপার হিরোইনখ্যাত ইমরান, সানসি ফারুক, আব্দুর রহমান রাজীব, আর জে মুকুল ও সাকি ফারজানা, সিডর সুমন, মাটির, সাজ্জাদ লিটন, মুক্তা, সম্রাট, শুভ, আব্দুর রহমান রাজীব, জগন্ময় পালসহ চারশ’ নাট্যকর্মী। শিশুশিল্পীরা হল মারুফ, কাব্য, অর্ণব, স্বপ্ন, কিন্নর ও ঋদ্ধ।” চলচ্চিত্রটির সংগীত পরিচালনা করেছেন রাফায়েত নেওয়াজ ও সম্পাদনা করেছেন সাব্বির মাহমুদ।

‘গাড়িওয়ালা’র আন্তর্জাতিক পুরস্কারের ফুলঝুরি…
এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে অন্তত ৩৬টি চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয় আশরাফ শিশিরের চলচ্চিত্র ‘গাড়িওয়ালা’। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, গ্রীস,পর্তুগাল,কম্বোডিয়া,আরব আমিরাত, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরের প্রদর্শীত হয়েছে ছবিটি, জিতে এনেছে অসংখ্য পুরস্কার।

পয়সা থাকবে না দুগগা, কাজগুলো থেকে যাবে…
শেষ করার আগে বিশ্ব সিনেমার এক দাপুটে ফিল্ম মেকারের কথা বলি, যার নাম ইনারিতু; আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু। ম্যাক্সিকান এই নির্মাতা এখন বিশ্বজুড়ে অন্যতম পরিচিত একটি নাম, এ বছর ‘দ্য বার্ড’ সিনেমার জন্য অস্কারও অর্জন করে নিয়েছেন। অথচ এই নির্মাতা একদিন ছিলেন অখ্যাত এক বিজ্ঞাপন নির্মাতা। ম্যাক্সিকোতে তাকে কেউ কখনো মূল্যায়ন করেনি। এমনকি তার প্রথম ছবি ‘অ্যামেরস পেরোস’ যখন নানান লড়াই-সংগ্রাম করে তিনি নির্মাণ করলেন, তখনও তাকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি দিয়েই দেখতো ম্যাক্সিকান ‘ফর্মূলা’ ছবির মানুষেরা। অথচ দিনের পর দিন যখন ওই চলচ্চিত্রটি বহির্বিশ্বে বড় বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেতে শুরু করলো, তখন ম্যাক্সিকোর মানুষেরা সম্বিৎ ফিরে পেলো, তারা বুঝে গেলো ইনারিতু আসলে কে!

বর্তমান সময়ের বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাভশালী নির্মাতাদের সাথে হয়তো কেবল চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করতে আসা আশরাফ শিশিরকে তুলনা করছি না; কিংবা একের সাথে অন্যের তুলনা স্রেফ বোকামি। কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রতি তার এই আন্তরিকতাও ছোট করে দেখার অধিকার আমাদের নেই। সত্যজিৎ রায় কিংবা হাল সময়ের ইনারিতুর মতো নির্মাতার সংগ্রাম আমাদের দেশী নির্মাতা আশরাফ শিশিরের জন্য অনু্প্রেরণা হউক। শুভ হোক তার যাত্রা, এগিয়ে চলুক সিনেমার এই গাড়িওয়ালা…

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Most searched keywords: Insurance, Loans, Mortgage, Attorney, Credit, Lawyer, Donate, Degree, Hosting, Claim, Conference Call, Trading, Software, Recovery, Transfer, Gas/Electricity, Classes, Rehab, Treatment, Cord Blood, domain, music, mobile, phone, buy, sell, classifieds,recipes
Top