হারিয়ে যেতে আছে ‘মানা’

কী এত কথা বন্ধুদের সঙ্গে! বন্ধুদের সঙ্গে এখানে-সেখানে যাওয়ার বা কী দরকার! কলেজ পার্টি, রাত অব্দি জন্মদিন—কখনো হুটহাট লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়া; কেউ বা কয়েকজন বন্ধু জুটিয়ে বলা নেই কওয়া নেই চলে যাচ্ছে বান্দরবান বা সুন্দরবন—প্রথম যৌবনেই এতটা স্বাধীনতা কি দেওয়া উচিত? মা-বাবা বা অভিভাবক এমনটা দুশ্চিন্তা করবেন, সেটা অস্বাভাবিক নয়।
আবার উল্টো সন্তানের দিকে থেকেও যুক্তি কম নয়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা দল বেঁধে বেড়াতে ও ঘুরতে যাওয়া তো বখে যাওয়া নয়। বরং দেশকে জানতে হবে—দেখতে হবে চারপাশ। ইট-কাঠের নগরে বন্দী কারাগারের জীবন মানেই ননির পুতুল বা কাঠপুতুল হয়ে বড় হওয়া। মা-বাবা কেবল সেটাই চান!
মা-বাবা, অভিভাবক ও সন্তান—দুই পক্ষের বক্তব্যেই আছে নানা যুক্তি। সেই সঙ্গে আছে দুই প্রজন্মের দুই রকম করে দেখা ও জানার ভঙ্গি। শৈশব-কৈশোর পেরোনো যৌবনমাত্রই নিরাপদ নয়। পায়ে পায়ে থাকে বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা। কোনো বিপদ ঘটে কি না, সে আশঙ্কা থেকেই জন্ম নেয় নানা রকম বিধিনিষেধ। হারিয়ে যেতে মানা করার মধ্যে বাধা দেওয়ার চেয়ে সন্তানের প্রতি মা–বাবার মঙ্গলচিন্তাটাই বেশি কাজ করে।
সন্তান কেন এত সাহসী হতে চাইবে, তার এত স্বাধীনতা কেন দরকার—সময়ের ও নতুন প্রজন্মের চাহিদা ও স্বপ্নের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না অনেক মা-বাবাই।
কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা দেওয়ার সময়ে সবার মধ্যে স্বাধীনচেতা ভাব চলে আসে। অনেক কিছু পারি; অনেক কিছু বুঝি—এমন একটা সবজান্তা ও হামবড়া ভাব। নিজের বুঝে নিজে চলতে পারব। সিদ্ধান্ত নিতে কারও সাহায্য লাগবে না। কোনো সমস্যা হবে না। এ রকম চেতনা উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢোকার পরপরই সবার মধ্যে কমবেশি দেখা যায়। কেউ প্রকাশ করে; কেউ করে না। নতুন চলার পথ, নতুন সম্ভাবনা, রঙিন স্বপ্নময় নতুন পরিবেশ।
স্কুল পর্যায়ে সহশিক্ষা এখনো বহুল প্রচলিত নয়। এখনো অনেকে কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথমবারের সহশিক্ষার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়।
মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত যারা শুধু বালক বা বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছে, হঠাৎ করে সহশিক্ষা বা কো-এডুকেশনে আসা নতুন এক অভিজ্ঞতা। অভিভাবকেরাও অনেকে বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারেন না। দুশ্চিন্তায় থাকেন সহশিক্ষায় এসে সন্তান প্রেমে জড়াল কি না, কোন ঝামেলা বাধাল কি না। যদিও সহশিক্ষা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কিছু নয়। স্কুল-কলেজেও এখন সহশিক্ষা বেশ চালু হয়েছে। তারপরও অভিভাবকের পুরোনো মন সবকিছুকে মেনে নিতে পারে না সহজে।
নতুন পরিবেশ সবার চোখে ও মনে রঙিন আবেশের পরশ বুলিয়ে যায়। সবাই নিজেকে অন্যের চোখে আকর্ষণীয় করে তোলার অনন্ত চেষ্টা করে চলে। সেটা পোশাক-আশাকে, কথাবার্তায়, আচার-আচরণে, এমনকি ক্লাসে পারফরম্যান্সের মাধ্যমেও। অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হাস্যকর ঘটনাও ঘটে প্রচুর। মার্কিন এক মঞ্চ কথক রাচেলের ভাষায়, যৌবন মানেই খাপ খোলা তলোয়ার। শুধু যে চকমক করে, তা-ই নয়। বিপরীত লিঙ্গের ছেলে বা মেয়েকে কাটেও। তাঁর মতে, প্রথম যৌবন মানেই জীবনের উদ্বোধন। এই সময়টা সত্যিই বাঁধনহারা।
উচ্ছ্বল তারুণ্যে অনেক সময় নিজের ইচ্ছেই বড় মনে হয়। মডেল: সূচনা ও সায়রা। ছবি: কবির হোসেনহোস্টেল জীবনের একটা আলাদা আমেজ আছে। পরিবারের নিত্যদিনের গণ্ডির বাইরে নতুন এক জীবন। আবাসিক হলের জীবন আরও অন্য রকম। বাড়ির সবাইকে ছেড়ে প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও পরে সবাই খাপ খাইয়ে নেয়। আর যারা বাসায় থেকে পড়াশোনা করে, তাদের আর এই জীবনের মজা পাওয়া হয় না। তারপরও অনেকে পরীক্ষার অজুহাতে মাঝেমধ্যে হলে চলে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে পড়তে হবে। কেউ বা চলে যায় বন্ধুর বাসাতেও। মা-বাবার জন্য এটা মস্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। বাসায় বসে পড়ালেখা করলে দোষ কী। সন্তান কৌশলে বন্ধুর বাসায় রাত কাটানোর সুযোগ নিচ্ছে কি না, সেই সন্দেহও পেয়ে বসে।
এখন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাসফর, বনভোজনের আয়োজন হয়েই থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কক্সবাজার, বান্দরবান, ভারতের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় প্যাকেজ টুরে যায়। ঢাকার অদূরে পিকনিক স্পট গড়ে উঠেছে। এদেরও আকর্ষণীয় প্যাকেজ রয়েছে। বুনোরাত; আগুনে ঝলসানো মাছ, মুরগি খাওয়া, অবিরাম আড্ডা দেওয়া। এমন পরিবেশ তরুণ-তরুণীদের জন্য স্বপ্নময় হলেও মা-বাবার জন্য বেশ অকল্পনীয়।
এক মেডিকেল ছাত্রীর কাছে শুনলাম করুণ এক কাহিনি। তার ভাই তিন বন্ধুসহ কক্সবাজার গিয়েছিল বেড়াতে। হঠাৎ পরিবারের কাছে খবর এল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওর ভাইয়ের সংজ্ঞাহীন দেহ এসে পৌঁছেছে। সমুদ্রসৈকতে পাথরের আঘাত লাগে ওর ভাইয়ের মাথায়। শেষ পর্যন্ত ওকে বাঁচানো যায়নি। অন্য বন্ধুরাও কম বয়সী। হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে ছিল সবাই। হঠাৎ সমুদ্র দেখার উন্মাদনার জের যে এভাবে টানতে হবে, কে ভেবেছিল! সাগর কিংবা পাহাড়ে বনভোজন বা শিক্ষাসফরে গিয়ে নানা দুর্ঘটনার খবর মাঝেমধ্যেই সবাইকে বেদনায় আপ্লুত করে তোলে।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রেমে পড়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ সম্পর্ক কতখানি জোরদার হবে, তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। কেউ কেউ এক সম্পর্ক ছেড়ে আরেক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কাকে ধরি কাকে ছাড়ি; শ্যাম রাখি না কুল রাখি—এ রকম দোটানায় পড়ে যায় অনেকে। প্রেম সমস্যা নয়। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে ঘিরে নানা সমস্যার জন্ম।
বাংলাদেশে এ-লেভেল করে ছেলেটি বাইরে গিয়েছিল উচ্চশিক্ষার্থে। সেখানে সে একটি বিদেশি মেয়ের প্রেমে পড়ে। দেশ থেকে পাঠানো টাকায় চলে না। সেখানে সে নিজেও কিছু আয় করে। সবই খরচ হয়ে যায়। কাজ করাই তার নিত্যদিনের রুটিন হয়ে ওঠে। আর পড়াশোনায় লবডঙ্কা। মায়ের অভিযোগ আর হতাশা, তিনি এখন কী করবেন? তার পক্ষে তো এত খরচ চালানো সম্ভব নয়।
ছেলেমেয়েরা এখন ফার্মের মুরগির মতো বড় হয়। সবকিছু হাতের কাছে পায়। নড়াচড়া কম। বাস্তব জীবনকে যথার্থভাবে মোকাবিলা করতে পারবে কি না, মা-বাবা এ আশঙ্কায় থাকে। তা থেকে নানা রকম দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনার জন্ম। একদিকে সন্তানের বাস্তবমুখী সমৃদ্ধ জীবন যেমন কামনা করেন, অন্যদিকে সন্তানের মঙ্গলের জন্য নানা রকম সাবধানতার কথাও সারাক্ষণ মাথায় ঘুরপাক খায়। বাড়ে দূরত্ব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। কিছু সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করে।
এখন কি করণীয়। মনোবিজ্ঞানী-চিকিৎসকেরা এ ব্যাপারে একমত—মনকে শিকল পরানো যায় না। শৃঙ্খলিত করা যায় না মনোবৃত্তিকেও। সময়ের চাহিদা ও বিকশিত নতুনত্বের বিষয়টিকে আমলে নিতেই হবে। সন্তানকে শৈশব থেকেই দিতে হবে ভালো-মন্দের শিক্ষা। ননির পুতুল হিসেবে বড় না করে শৈশব থেকেই স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠার অভ্যাস করানো উচিত। তাহলে হঠাৎ স্বাধীনতা বা নতুন পরিবেশে সে হাবুডুবু খাবে না। বরং নিজেকে সামলে নিতে পারবে। খাপ খাওয়াতে পারবে পরিবর্তিত জীবনের সঙ্গে।

মা-বাবা ও অভিভাবক যা করবেন—
* সন্তানের অতিরিক্ত স্বাধীনতা, যেমন প্রশ্রয় দেবেন না। তেমনি তার স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর, এমন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করবেন না।
* তাকে মুক্তভাবে চলার অবকাশ দিন। কথায় কথায় সন্দেহ নয়।
* সন্তান আউটিং, পিকনিক, কলেজ পার্টি বা স্টাডি টুরে যেতে চাইলে কেবল সন্দেহের বশে বাধা দেবেন না। বরং খোঁজখবর করুন। কাদের সঙ্গে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে। আয়োজক কারা। পাহাড়-সমুদ্র বা বনজঙ্গল—গন্তব্য যা-ই হোক, সেটা নিরাপদ কি না।
* সন্তানের সব ব্যাপারে খবরদারি না করে ভালো-মন্দ খোঁজখবরের অধিকার কায়েম রাখুন। ভরসা দিন, তার সার্বিক ভালোর জন্যই এটা করা হচ্ছে।
* বিপরীত লিঙ্গের কারও সঙ্গে পরিচয়, মেলামেশা, চলাফেরা মানেই মন্দ বা নিষিদ্ধ নয়। সহশিক্ষায় ছেলেমেয়েতে বন্ধুত্ব হবেই। কোনো কোনো বন্ধুত্ব গড়াতে পারে গভীর সম্পর্কেও। এ ক্ষেত্রে রূঢ় আচরণই একমাত্র সমাধান নয়।
* অনেকেই বন্ধু-বান্ধবীর বাসায় আসা সমর্থন করেন না। বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের হলে কথাই নেই। এটা না করে তাদেরকে সহজ-মানবিকভাবে মিশতে দিন। বন্ধুত্ব নির্মল ও নিষ্কলুষ।

সন্তানের যা করণীয়—
* মা-বাবার পরামর্শ মানেই সেকেলে বা মান্ধাতার নয়। আধুনিক মা-বাবা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেন।
* মা-বাবা বা অভিভাবককে বৈরী ভাবার কোনো কারণ নেই। তারাই প্রকৃত বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী। যেখানে মতের অমিল, সেটা দুই পক্ষ একে অপরকে বুঝিয়ে সুরাহা অবশ্যই সম্ভব।
* মা-বাবার কাছে লুকানোর কিছু নেই। তাঁদের সঙ্গে শেয়ার করাই আখেরে মঙ্গল।
* সহপাঠীর সঙ্গে বন্ধুত্ব; কারা কারা বন্ধু—সেটা অভিভাবক জানলেই ভালো। তাতে নিরাপত্তাবলয়টা মজবুত হয়।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Most searched keywords: Insurance, Loans, Mortgage, Attorney, Credit, Lawyer, Donate, Degree, Hosting, Claim, Conference Call, Trading, Software, Recovery, Transfer, Gas/Electricity, Classes, Rehab, Treatment, Cord Blood, domain, music, mobile, phone, buy, sell, classifieds,recipes
Top