যৌনতা মানেই উচ্ছৃঙ্খল আচরণ নয়, এটা বৈধ

একটা করে ঘটনা ঘটে আর ‘নিউজ’ হয়। দুনিয়ার সব অনলাইন পত্রিকা, চব্বিশ ঘন্টা সেইসব খবর প্রচার করে আর অনলাইনবাসীরা সেইসব খবরের নিচে নিজেদের উগড়ে দেয়।
নিজের পরিচয় থেকে নিজের বর্জ্য পর্যন্ত। এবং পারলে বীর্যও। কিচ্ছু বাদ নাই।
আপনি বলতেই পারেন এইসব পড়েন কেন?

পড়ি আশায় রে ভাই।
মানুষ দেখার আশায়। বেঁচে থাকার,নিঃশ্বাস নেবার আশায়। একটা নতুন সম্ভাবনার আশায়।
মহান দার্শনিক ডায়াজেনিস নাকি ভরা হাটে বাতি হাতে মানুষ খুঁজতে বের হতেন।
আমারও দার্শনিক হওয়ার শখ হয়েছে। তাই পড়ি।

এক সদ্যই এসএসসি পাশ মেয়ে, সৎ বাবার চাচাতো ভাইয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্কের ফলে মা হয়েছে। যেহেতু বিবাহ হয়নি তাই সমাজের ভয়ে সেই কিশোরী মা তার সৎ বাবা এবং আপন মায়ের সহযোগীতায় বাচ্চাটিকে পাঁচতলার বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে ফেলে দিয়েছে।
সে এবারই এসএসসি পাশ করেছে অর্থাৎ হিসাব বলে বাচ্চাটাকে চারমাসের পেটে নিয়েই পরীক্ষা দিয়েছে সে। এবং পাশও করেছে। এই দীর্ঘ নয় মাস সে বাচ্চাটা পেটে নিয়ে ঘুরেছে।
খুব স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এতটা লম্বা সময় ধরে সে কিভাবে কোন পদ্ধতিতে প্রেগনেন্সির মতো একটা চরমভাবে দৃশ্যমান ঘটনাকে চাপা দিয়ে রাখলো? কেন রাখলো?

তার সৎ বাবা না হয় ভালোই সৎ। কিন্তু তার আপন মা’টি নিজ সন্তানের মঙ্গলের জন্য কী করেছে?
ধরা যাক শুরু থেকেই তারা জানতো। হয়তো যখন জেনেছে তখন গর্ভপাতের সময় পেরিয়ে গেছে। হয়তো যে এই সন্তানের পিতা সে পরে এই দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছে।
আমি ভাবছি কে জানে কিভাবে পার করেছে তারা ওই ভয়াবহ মুহুর্তগুলো। কত বেদনা কত যন্ত্রনা ভয় আতঙ্ক ওই পরিবারটিকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে এই দীর্ঘ সময়ে যে তারা শেষ পর্যন্ত আর মানুষই ছিলো না। অমানুষ হয়ে উঠে খুনের পরিকল্পনা করে ফেলেছিলো।

কেন করলো?
মেয়েটির আপন মাও প্রেগন্যান্ট। নিজের পেটে একটি সন্তানকে ধারণ করেও একজন ষোল সতের বছর বয়সী সন্তানের মা কী করে নিজ সন্তানের সন্তানকে পাঁচতলা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্তে সহমত হতে পারেন?
সবগুলো প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই জানি।

আমাদেরই ভয়ে। সমাজের ভয়ে। এরকম হলে সমাজকে ভয় পেতেই হয়।

খুন হওয়া বাচ্চাটির পিতা এই পরিবারটিরই নিকটজন -আত্মীয়। সে প্রবাসী। পলাশ নামের ওই লোকটি কি এই খুনের দায় অস্বীকার করতে পারবে ?
পারবে কি একটি অপ্রাপ্তবয়ষ্ক কিশোরীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের দায় অস্বীকার করতে?
করেছিলো নিশ্চয়ই তা নইলে আর সমাজের ভয়ে এমন কাণ্ড করবে কেন!

কদিন আগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটাও অনেকটাই এমন ছিলো না?
মাস্টার্সের এক ছাত্রী গোপনে সন্তান জন্ম দিয়ে ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রেখেছিলো!
সেটিও তো সমাজেরই ভয়ে।

এই যে প্রায় প্রতিদিন হসপিটালে, হসপিটালের বাথরুমে, বাসার সামনে, বাসার কার্ণিশে, ডাস্টবিনে সদ্যোজাত শিশু বা শিশুর লাশ পাওয়া যাচ্ছে এইগুলোকে আমরা শুধু একেকটা ঘটনা হিসেবে দেখছি। অনলাইনে আড্ডায় উদ্বেগ ঝরাচ্ছি। নিউজের নিচে কমেন্ট করে ঘটনার চরিত্রদের উপর নিজেদের ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছি তাতে কি ঘটনা কমবে ?

ষোল থেকে বছর তেইশ চব্বিশের মেয়েটিও যখন তার অনাকাঙ্খিত প্রেগনেন্সিকে চেপে বেড়ায়, কয়েকজন কিশোর মিলে যখন একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে, চৌদ্দ বছরের কিশোর যখন শতবর্ষী দৃষ্টিশক্তিহীন বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করে তখন সমাজের কাজ শুধু নড়েচড়ে বসা নয়, ছিঃছিঃ করা নয় । খবরটা পড়ে তার নিচে, ‘আর সইতে পারছি না’ ‘মানুষ এত নিষ্ঠুর কেন’ ‘কী নির্মম’ এইসব আহাজারি লিখে দায় সারা নয়। কিংবা ওই ‘খবিশ’ মেয়েকে পুনরায় ধর্ষণের ইচ্ছা জাহির করা, বা মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলা নয়। সমাজের সকলের এমন একটা কিছু করা দরকার যাতে এই ঘটনাগুলো আর না ঘটে, আর দেখতে না হয়। কারণ কোথাও না কোথাও এই ঘটনার দায় আমাদেরও, এই সমাজেরও।

কী করা যায়?

চারপাশে ভালো করে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় আমাদের সেই উচ্ছল কিশোর-কিশোরীরাও আজকাল হারিয়ে গেছে। তাদের বয়সোপযোগী আচরণের বাইরে গিয়ে তারাও নানা কারণে আজ যথেচ্ছ উচ্ছৃঙ্খলতা এবং অবাধ যৌনতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

আপনি তো মানুষের যৌনেচ্ছা কমাতে পারবেন না। সেখানে তো বিরাট কেলো! সারাদেশ ইয়াবার আখড়া। পর্ণের জন্য আপনি অবাধ যৌনতার মুক্তকচ্ছ দৌড় থামাতে পারছেন না চিরকালের সেই পুরনো সংস্কার আর ধর্মের দোহাই দিয়েও।
তারচেয়ে আসুন আমরা বরং একটু আমাদের সহ্যক্ষমতা বাড়াই।

না। আপনাকে এই অবাধ যৌনতা মেনে নিতে বলছি না কারণ এক্ষেত্রে আমিও পুরনো ধ্যানধারণার মানুষ। কিছুটা রক্ষণশীল। রক্ষনশীলতা এমন কিছু দোষেরও না। কেউ মুক্তমনা হতে চাইলে কেউ রক্ষনশীল হতেই পারেন।

তাহলে এই মেনে নেয়াটা আবার কেমন?

আপনি দোররা মারাটা ছাড়ুন। বুঝলেন না তো?

মানে আপনার চোখের সামনে কোন আত্মীয়র, পরিচিত বা প্রতিবেশীর কুমারী কন্যা প্রেগনেন্ট হয়েই গেলে, উঁচু পেট নিয়ে ঘুরলে আপনি মোরাল পুলিশ হয়ে তার পেছনে আর লেগে থাকবেন না। তাকে সাহায্য করতে না পারেন তার দুর্দশার ভাগী না হোন তাকে জ্বালিয়ে মারার, খোঁটা দেয়ার কাজটি বন্ধ করলে হয়তো অর্ধেক সমস্যাই কমে যাবে। থাকতে দিন তাদেরকে তাদের মতো। ওটিকে তাদের ব্যাক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখুন। জন্মানো ওই শিশুটিকে ‘জারজ’ বা ‘অবৈধ’ না বলে তাকে এই পৃথিবীর মানুষ হিসেবে দেখুন। তখন হয়তো কোন নাচার মা তার সন্তানকে কোলে নিয়ে অন্তত আপনাদের সামনে এসে তার পিতার পরিচয় দেবার সাহস অর্জন করবে। অথবা নিজেই একলা মা হয়ে কিংবা পরিবারের সহায়তায় নিজ সন্তানকে বড় করবে সব মানুষের এই পৃথিবীতে।
অর্ধেক সমস্যাই মিটে গেলো।

বাকি অর্ধেক সমাধা হবে সঠিক যৌনশিক্ষার মাধ্যমে।

এখানে আবার আরেক দার্শনিকের কথায় আসি। কোন এক বিখ্যাত দার্শনিক নাকি বলেছিলেন, ছাত্রদের অপারগতার জন্য শিক্ষককে কেন দায়ী করা হবে না!

আসলেই তো। যদি স্কুলে শিক্ষকরা সঠিক শিক্ষা দিতেন, তবে ওই কিশোরীর সৎ পিতা ও মা শিক্ষিত হতেন। তিনি তার কন্যার সন্তানকে অন্তত সন্তান হত্যার পরামর্শ দিতেন না। কাপুরুষ পলাশ তার পিতৃত্ব স্বীকার করে বাচ্চাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইতো।

অথবা কিশোরীটি যদি তার স্কুলেই সঠিক যৌনশিক্ষা পেতো, তবে সে অনিরাপদ যৌন-সম্পর্ক বিষয়ে সচেতন থাকতো। অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের ফলে গর্ভবতী হলে কখন কী করতে হবে সে সম্পর্কে জানা থাকতো।

যৌনশিক্ষা শুধু যৌন সম্পর্ককে নিরাপদ করার জন্য দরকার না। শিশু কিশোরদের যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্যও দরকার। স্কুলে অন্তত ষষ্ঠ শ্রেনী থেকেই এই শিক্ষা দেয়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। এবং বাড়িতেও সচেতন অভিভাবকরা অবশ্যই যেন সন্তানদের শিক্ষা দেন সেজন্য রেডিও টিভি পত্রিকা যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে।

ঘা লুকিয়ে বসে থাকলে খতরনাক প্রাণঘাতি ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। তেমনি যৌনতার এই চলমান উচ্ছৃঙ্খলতাকে সংস্কার আর ধর্মের চাদরে ঢেকেঢুকে চেপে রাখতে চাইলে এইসব শিশুর থ্যাতলানো লাশ সামনে আরো অনেক দেখতে হতে পারে।

পরিস্থিতি যে কারণেই হোক বদলে গেছে। পৃথিবী এগিয়ে গেছে। সেই সাথে আমাদের শিশু-কিশোররাও। আমাদেরও বদলাতে হবে। কারণ ওরাই দেশের ভবিষ্যত। তাই আমাদের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে কিছু করণীয় ঠিক করতে হবে।

তাদের শেখাতে হবে যৌনতা কোন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ নয়, উহা বৈধ। তবে এই বৈধতা কখন কীভাবে একজন মানুষ অর্জন করে সেটাই শিক্ষনীয় বিষয়।
শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।
একমাত্র পরিকল্পিত শিক্ষাই এখন আমাদের এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে পারবে। নইলে মরণ। মানুষের এবং সভ্যতারও।

কমেন্টসমুহ
সিক্রেট ডাইরি সিক্রেট ডাইরি

Top