ট্রেনের টিকিট এবং আমাদের সাদা–কালো ঈদযাত্রা

আপনি কি জানেন? বিমানের চেয়ে ট্রেনের টিকিটের দাম কম! ভাবছেন এটা আবার কেমন কথা! ট্রেনের টিকিটের দাম তো কমই হওয়ার কথা। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু বিমানের চেয়ে ট্রেনের টিকিটের দাম কত কম হওয়ার কথা? বিমানের টিকিট আর ট্রেনের টিকিটের ফারাক মাত্র ৫০০ টাকা! বিশ্বাস হচ্ছে না? সেই কাহিনি বলে আপনাদের কৌতূহল মেটানো হবে। ধৈর্য ধরুন।

সবারই জানা যে বহু উন্নত দেশে ট্রেনের টিকিটের দাম বিমানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেশি হয়। এর কারণ ট্রেনের যাত্রা অনেক স্বস্তিদায়ক। আর সেবার মানও সেসব দেশে অনেক উন্নত। দেশ হিসেবে আমরাও উন্নত হচ্ছি। তাই আমাদেরও পাল্লা দিয়ে ট্রেনের টিকিটের দাম বিমানের চেয়ে বেশি হওয়ার কথা ছিল। উন্নত দেশের মতো আমাদের রেলের সেবা উন্নত কি না, সেটা নিয়ে মন্তব্যহীন থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য। কিন্তু তারপরেও ৫০০ টাকা কমে ট্রেনের টিকিট পাওয়াটা নিশ্চয়ই অনেক বড় খবর!

ঈদ উপলক্ষে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার বিমানের টিকিট আড়াই হাজার টাকায় পেলাম। কিন্তু যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে দেখলাম ভাগ্যবিধাতা বেশ নাখোশ। তা অবশ্য তিনি প্রতি ঈদেই থাকেন। ভাগ্যবিধাতার সঙ্গীরাও নাখোশ থাকেন। কালোবাজারি নামে পরিচিত ভাগ্যবিধাতার এসব সঙ্গীরা দ্বিগুণ–তিন গুণ দাম ছাড়া টিকিট নামের ‘আশীর্বাদ’ দিতে চান না। কারণ আশীর্বাদ প্রদানের এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেকগুলো মানুষের ‘শ্রম–ঘাম’ জড়িত। সবারই কিছু না কিছু প্রাপ্য! তাই এক হাজার টাকা দামের টিকিট অগত্যা দুই হাজার টাকা দিয়েই কিনতে হলো।

বলতে পারেন কালোবাজারের দাম তো ধর্তব্য নয়। এটা দিয়ে কীভাবে তুলনা চলে! কিন্তু মানুষের পকেট থেকে যেহেতু টাকা যাচ্ছে আর সঠিক চ্যানেলে যেহেতু টিকিট পাওয়া আকাশের চন্দ্র জয়ের সমান, তাই এটা ধর্তব্য মনে হওয়া কর্তব্য।

এ দেশের রাস্তাঘাট নিয়ে মানুষ সর্বদা আতঙ্কগ্রস্ত থাকে। তাই ভরসার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে রেলপথ। এই আতঙ্ক শুধু রাস্তার বেহাল অবস্থার জন্যই নয়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেহাল থাকে প্রতিবারই। তাই রেলপথে যাওয়ার টিকিটের জন্য থাকে উপচে পড়া ভিড়। এবার রাস্তাঘাটের অবস্থা নিয়ে এখনো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে জুন মাসের ৩০ তারিখ থেকে বৃষ্টিপাত বাড়বে। তখন পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে বিভিন্ন জায়গায় নতুন কিছু উদ্যোগের ফলে রাস্তার যানজট সহনীয় হবে বলে ভাবা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা–চট্টগ্রাম সড়কে ও ঢাকা–উত্তরবঙ্গ সড়কে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ এই পথে চলাচলকারী মানুষকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করেছে।

ভোগান্তি কমানোর জন্যই এবার ঢাকায় টিকিট বিক্রি করা হয়েছে পাঁচটি আলাদা জায়গায়। তার চেয়ে বড় বিষয় ছিল ৫০ শতাংশ টিকিট অনলাইনে আর অ্যাপের মাধ্যমে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত। এটা বেশ ভালো উদ্যোগ ছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ করতে হলে একসময় ১০০ ভাগ টিকিটই তো অনলাইনে কাটার সুযোগ থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যে একটি বড় সংযোজন দেখে খুশিতে মানুষের যখন কাঁদো কাঁদো অবস্থা, ঠিক তখনই এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২২ মে। রেলপথে ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরুর তারিখ এটি। আর এদিন থেকে শুরু হয় মানুষের সুখের বদলে দুখে কান্নার দিন।

মানুষ পরিবারের সঙ্গে একটা উৎসব কাটাবে। নাগরিক হিসেবে এটা আসলে কত বড় প্রত্যাশা? তবে অন্য কোথাও না হোক, আমাদের দেশে এটাও অনেক বড় চাওয়া। যাহোক, সেই প্রত্যাশা পূরণের ভার যাদের ওপর, তারা কী করছেন?

আগেই বলা হয়েছে যে রেলপথে যাত্রীর প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। সেটা দেখভাল করার জন্য পুরোদস্তুর একটা মন্ত্রণালয় রয়েছে আমাদের। কিন্তু ফলাফল কী দাঁড়িয়েছে? মানুষ অনলাইনে বা অ্যাপে টিকিট পাচ্ছে না বলে অনবরত অভিযোগ করে যাচ্ছে। আর অন্যদিকে সব টিকিটও বিক্রি শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোন ‘ডিজিটাল’ যন্ত্রের বলে এটা ঘটছে সেটা বোধগম্য নয়। সাধারণ মানুষের কাছে কালোবাজারিরা যেহেতু ভাগ্যবিধাতার সঙ্গীর মতো, তাই তাদের ক্যারিশমা আমজনতার বুঝতে পারার কথাও নয়।

স্বাভাবিক সময়ে মানুষের ভিজিট করার হার কম থাকে তাই সার্ভার সচল থাকে। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে একসঙ্গে বহু মানুষ ঢুকতে চেষ্টা করলে সার্ভার অচল হয়ে পড়ে। লোড ডিস্ট্রিবিউশন করে এই সমস্যা সমাধান করা যায়। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে যেহেতু এত চাপ থাকে না, শুধু ঈদের মতো নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের সুবিধার জন্য এটুকু খরচের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টরা ইচ্ছুক নয়। মানে বৃহত্তর নাগরিক সুবিধার চেয়ে মুষ্টিমেয় মানুষের সুবিধাই অগ্রগণ্য।

এখন কথা হলো প্রতিবারই তো ঈদের সময় এলে সার্ভার অচল হয়ে পড়ছে। সেটা জানার পরও সার্ভার সচল রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়েই ৫০ শতাংশ টিকিট অনলাইন ও অ্যাপের উঠোনে ফেলে দেওয়ার কি মানে থাকতে পারে? বোঝাই যাচ্ছিল এর ফলে টিকিটের একটা কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি হবে। আর সেই সুযোগে কালোবাজারিদের রমরমা ব্যবসা হবে। কারণ টিকিটের সম্পূর্ণ পরিমাণকে আধাআধি করে বাজারে ছাড়া হয়েছে। রেলপথের অগ্রিম টিকিট বিক্রির প্রথম দিনই রেল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেছেন যে সার্ভার ঠিক না হলে অবিক্রীত টিকিটগুলো কাউন্টারে ছেড়ে দেওয়া হবে। এ ছাড়া বলেছিলেন অনলাইন সেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিএনএসের সঙ্গে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চুক্তি আছে। যদি তারা সেবা ভালো না দেয় তাহলে চুক্তি নবায়ন হবে না।

অতএব, আগামী ঈদেও কালোবাজারিরাই ভরসা। শুনতে কটু মনে হলেও অস্বীকার করা যাবে না যে ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রে ডিজিটাল বাংলাদেশ চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে।

আর অনলাইন সেবা পরিচালন প্রতিষ্ঠান সিএনএস নিয়ে মানুষের রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। সার্ভার বিভ্রাট শুধু ঈদ নয়, বড় কোন বন্ধ পড়লেই শুরু হয়। টাকা কেটে নেওয়ার পরে টিকিট না পাওয়ার অভিযোগও পুরোনো। এ ছাড়া প্রতি টিকিট বাবদ ২০ টাকা করে তারা অতিরিক্ত আদায় করে। যদিও এখন দেশে অনেকগুলো ইন্টারনেট পেমেন্ট গেটওয়ে দিয়ে বিনা মূল্যে বা খুব স্বল্প মূল্যে এসব অনলাইন লেনদেন করার সুযোগ আছে। সিএনএসের কর্মীদের বিরুদ্ধেও জালিয়াতির অভিযোগ আছে। গত বছর রেলওয়ে থানা–পুলিশের কাছে একজন কর্মী ধরা পড়ে ভোক্তা অধিকার আইনে শাস্তিও পেয়েছেন।

২০০৭ সাল থেকে এই সেবা দিচ্ছে সিএনএস। এত বছর কেন লাগছে তাদের সেবার মূল্যায়ন করতে তা বোধগম্য নয়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চুক্তি আছে, তাই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে দেশে আরেকটি ঈদ আসবে। মানুষ আবার একই ভোগান্তিতে পড়বে। সেগুলোর চেয়ে এই চুক্তি রক্ষা করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হবে? সিএনএসের জন্য রেল বিভাগ নাকি রেলকে সেবা দেওয়ার জন্য সিএনএস? কে কার কাছে জিম্মি?

টিকিটের জন্য যে হারে প্রতিযোগিতা, লাইন আর ভোগান্তি, সেটা পারতপক্ষে কেউ সহ্য করতে চায় না। দক্ষ অনলাইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিয়ে এই ব্যবস্থা শতভাগ ডিজিটাল করতে হবে। তা না হলে কালোবাজারি হবেই। কিন্তু অভিযোগ বক্সে কোনো অভিযোগ জমা পড়বে না। এরপর যথাযথ কর্তৃপক্ষ বলবে, কোনো অভিযোগ আসেনি।

কমেন্টসমুহ
সিক্রেট ডাইরি সিক্রেট ডাইরি

Top