জাতীয় চাঁদ দেখা কমেডি!

ইস্যুটা পুরনো হলেও জরুরি। ঈদ পার হয়েছে বলেই আলোচনাটা ভুলে গেলে চলবে না। তাই লিখব না লিখব না করেও লিখে ফেললাম। আর মক্কায় টেলিস্কোপ বসানোর খবরটা দেখে ভাবলাম, দেরিতে হলেও লেখাই উচিৎ।

এখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রযুক্তির উন্নত স্তরে বাস করছি। ঘরে ঘরে টেলিভিশন, হাতে হাতে মোবাইল, গাড়িতে গাড়িতে এফএম রেডিও। মানে সংযুক্ত হওয়ার সব উপাদান আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে, বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগই নেই। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বটাই যেন একটা গ্রাম এখন। আশির দশকে, আমার এক বন্ধুর বড় ভাই জাপান থাকতেন, তার সঙ্গে মাসে একবার কথা বলার জন্য বন্ধুর মা-বোনসহ পরিবারের সবাই গাড়ি ভাড়া করে কুমিল্লা শহরে আসতেন। জিপিওর কয়েন বক্স থেকে নির্দিষ্ট সময়ে জাপানে ফোন করে সবাই লাইন ধরে একে একে কথা বলতেন। সে কথায় আবেগ, ভালোবাসা, হাসি-কান্না, মান-অভিমান, জমিজমা, টাকা-পয়সার হিসাব সবই থাকতো। মাসে একবার কথা বলাটা বেশ ব্যয়বহুল আয়োজন ছিল। মাইক্রোবাস ভাড়া করে শহরে আসাই ছিল বিশাল ঝক্কির। আর এখন আমেরিকা থেকে মেয়ে মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে থেকে রান্না করে। হাজার মাইল দূরে বসে মা-বাবার ওষুধের খোঁজ রাখে সন্তান।

এখনকার সময়টা যেমন সংযুক্তির, আমাদের সময়টা ছিল তেমনি বিচ্ছিন্নতার। তবে সে বিচ্ছিন্নতা ছিল আনন্দের। আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। কয়েক গ্রাম মিলে হয়তো একটা টিভি ছিল। ঈদের দিন টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখতে আমাদের কয়েক মাইল হেঁটে যেতে হতো। দাউদকান্দির শহীদনগরে আমাদের গ্রামের বাড়ির উল্টো দিকে একটা ওয়ারলেস অফিস ছিল। তাতে একটা বড় টাওয়ার ছিল। সন্ধ্যায় সেই টাওয়ারের ওপরে একটি আলো জ্বলতো। আশেপাশের অন্তত ২০ মাইল দূর থেকে সেই আলো দেখা যেতো। ছেলেবেলায় আমরা ইফতার করতাম ওয়ারলেসের সেই ‘লাইট’ দেখে। রোজা রেখে তৃষ্ণায় আমাদের বুক ফেটে যেতো। হাতে পানি নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে থাকতাম, যাতে ওয়ারলেসের লাইটটা সবার আগে দেতে পাই। তবে সেহরির সময় জানার কোনো উপায় ছিল না। শুনতাম, যতক্ষণ হাতের পশম দেখা না যাবে, ততক্ষণ নাকি খাওয়া যায়। তবে অতদূর যেতে হতো না। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, তাই ফ্রিজের তো প্রশ্নই ওঠে না। সবাইকে প্রতিদিন রান্না করতে হতো। মধ্যরাতেই জেগে উঠতো পুরো গ্রাম। মা-চাচিরা মাটির চুলায় রান্না চড়াতেন। মধ্যরাতে গ্রামে একটা পিকনিক পিকনিক আবহ তৈরি হতো। হইচইয়ে কারো পক্ষেই ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। তাই সেহরির সময় পেরিয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। একবার মনে আছে, শবে কদরের রাতে মধ্যরাত পর্যন্ত নামাজ পড়ে ক্লান্ত হয়ে একটু জিরিয়ে নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মায়া করে কেউ আর ডাকেনি। সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

তবে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা হতো ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে। ইফতারের পরপরই আমরা মসজিদ এলাকায় চলে যেতাম। কেউ মসজিদের ছাদে বা মিনারে উঠে যেতাম। এমনকি কেউ লম্বা গাছেও চড়ে বসতো। মানে চাঁদ দেখার জন্য আকাশের যত কাছে যাওয়া যায়। ঈদের চাঁদ এক চিলতে, থাকেও খুব অল্প সময়। নিজের চোখে ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দই অন্য রকম ছিল। আর যে প্রথম চাঁদের দেখা পেত, সে যেন চ্যাম্পিয়ন। আমি বলছি আশির দশকের কথা। তখন জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ছিল কিনা জানি না। তবে কোনো বিভ্রান্তির কথা শুনিনি। ঈদের সিদ্ধান্ত নিতে মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। রেডিওতে ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ…’ শুনলেই বুঝতাম ঈদ চলে এসেছে।

যুগে যুগে কত অগ্রগতি হলো, কত প্রযুক্তি এল; কিন্তু ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রান্তিও যেন বাড়ল। নব্বইয়ের দশকে একবার মধ্যরাতে ঈদের ঘোষণা এসেছিল। এবার আবার একই ঘটনা ঘটলো। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে এই ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। এমনিতে বাংলাদেশে দুই দিনে ঈদ হয়। চাঁদপুর, বরিশালসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে ঈদ উদযাপিত হয়। আর দেশের অধিকাংশ স্থানে ঈদ হয় বাংলাদেশে চাঁদ দেখে। কিন্তু এবার ঈদ হয়েছে তিনদিনে। কিছু মানুষ সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে একদিন আগে ইদ করেছে। কিছু মানুষ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে ঈদ করেছে। কিছু মানুষ আবার ঈদ করেছে ৩০ রোজা পূর্ণ করে। তার মানে এবার দেশে ঈদ হয়েছে তিন দিনে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। ভুলে-বিভ্রান্তিতে এবার কাউকে না কাউকে এই কাজটি করতে হয়েছে।

৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে চাঁদ দেখা নিয়ে, ঈদ নিয়ে এমন বিভ্রান্তি দুর্ভাগ্যজনক। দাবি জানাচ্ছি, ইসলাম ধর্মের যারা আলেম, তারা যেন ইসলামের বিধি বিধান মেনে দেশে ঈদ পালনের এবং চাঁদ দেখার একটা সর্বসম্মত রীতি প্রচলন করেন। দেশে যেন একদিনেই ঈদ হয়। তিন দিনে তো নয়ই, দুই দিনেও যেন দেশে ঈদ না হয়। মুসলমানদের মধ্যে যদি ধর্ম পালনের এইটুকু ঐক্যও না থাকে, তাহলে অন্য শত্রুর মোকাবেলা তারা কীভাবে করবে?

এখন বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এতটাই অগ্রগতি হয়েছে যে শুধু আগামী মাসের নয়, আগামী অনেক বছরের চাঁদ ওঠার দিনক্ষণ বলে দেয়া সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, ধর্ম বিজ্ঞান দিয়ে চলে না। আকাশে চাঁদ উঠলেই হবে না। ইসলাম ধর্মমতে অন্তত দুই জন মানুষকে নিজের চোখে চাঁদ দেখতে হবে। এবার যে ৪ জুন রাতেই চাঁদ দেখা যাবে, সেটা অনেক আগেই নির্ধারিত ছিল। সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তানের চাঁদ দেখার হিসাব অনুযায়ীও ৪ জুন রাতেই চাঁদ দেখা যাওয়ার কথা।

বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠকে জানিয়েছিল, ৪ জুন বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ উঠেছে এবং ৭টা ৫১ মিনিটে ডুবেছে। চাঁদের দৃশ্যমান অংশ ছিল মাত্র শতকরা ১ ভাগ। আকাশে চাঁদের উপস্থিতি ছিল ৪৫ মিনিট। কিন্তু সমস্যা হলো, চাঁদ উঠলেও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় চাঁদ দেখার কোনো সাক্ষ্য ছিল না। তাই ঈদের ঘোষণা দেয়াও সম্ভব ছিল না। কিন্তু তাই বলে জেনেশুনে চাঁদ ওঠার পরও রোজা রাখাও তো সম্ভব নয়। কিন্তু ৪ জুন রাত ৮টায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি জানিয়ে দিল- দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি। তাই ঈদ হবে ৬ জুন বৃহস্পতিবার।

ঈদের সব প্রস্তুতি নিয়েও ঈদ না হওয়ার ঘোষণায় সবাই রোজার প্রস্তুতিতে লেগে যান। ঈদের বদলে সেহরির প্রস্তুতি। অনেকে তারাবির নামাজ পড়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কেউ কেউ ঘুমিয়েও গিয়েছিলেন। গৃহিনীরা চুলা থেকে ঈদের রান্না নামিয়ে ফেলেন। শপিং মলে আরো একদিনের ব্যবসার উল্লাস। তখনই খবর এলো, জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি আবার বৈঠকে বসছে। রাত সোয়া ১১টার সময় ঘোষণা এলো, ঈদ ৫ তারিখেই হবে। দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য। আবার সব উল্টে দিতে হলো। পুরান ঢাকার মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যায় একটি ‘চান রাইত’।

ঈদ একদিন আগে হবে না পরে হবে, তা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। বহু বছর ধরে ঈদে অফিস করতে হয়। তাই ঈদ নিয়ে বাড়তি কোনো উচ্ছ্বাসের সুযোগই নেই। তবে রাত সোয়া ১১টার সময় ঈদের ঘোষণাটা বাড়াবাড়ি। রাত ৮টায় চাঁদ দেখা না যাওয়ার ঘোষণা দেয় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। তবে এই ঘোষণা শোনার পর কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী থেকে কিছু লোক দাবি করেন, তারা যথাসময়েই চাঁদ দেখেছেন। চাঁদ যে দেখেছেন, এটাই সত্য। কারণ চাঁদ উঠেছিল। তবে চাঁদ উঠেছিল, এটা নিশ্চিত হওয়ার পরও চাঁদ দেখা কমিটি কেন, চাঁদ দেখা যায়নি বলে ঘোষণা দিয়ে পুরো জাতিকে বিভ্রান্তিতে ফেলল? চাঁদ দেখা কমিটির উচিৎ ছিল, আরো নিশ্চিত হওয়া, প্রয়োজনে অপেক্ষা করা।

কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর লোকজন নিশ্চয়ই রাত ১১টার সময় চাঁদ দেখেনি। শাওয়াল মাসের চাঁদ তো উঠেছিল ৫টা ৪০ মিনিটে, ডুবেছে ৭টা ৫১ মিনিটে। তাহলে তারা আগে প্রশাসনকে জানায়নি কেন? এত গুরুত্বপূর্ণ যে চাঁদ দেখা কমিটি, তারা তাহলে সারাদেশ থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করেনি। আসলে করার চেষ্টাই করেনি। ৬৪ জন জেলা প্রশাসককে ফোন করেই হয়তো কাজ সেরেছে। আর জেলা প্রশাসকরাও যে সব তথ্য সংগ্রহ করেননি, সেটা তো এখন প্রমাণিত। করলে ৮টার ঘোষণা ১১টায় দিতে হত না।

বাংলাদেশে যে আবহাওয়া, আকাশ প্রায়শই মেঘলা থাকতে পারে। তাই নিয়মিত না হলেও মাঝে মধ্যেই ঈদ নিয়ে, চাঁদ দেখা নিয়ে এ ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই সরকারের উচিত এ ব্যাপারে একটি স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া। স্থায়ী ব্যবস্থা হলো, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হবে। তবে সেটা ধর্মীয় বিধান মেনে, আলেমদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতেই হতে পারে। মান্ধাতা আমলের ডিজিটাল পদ্ধতিতে জনে জনে খুঁজে চাঁদ দেখার খবর সংগ্রহ করলে হবে না।

চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রন্তি ঘোচাতে সৌদি আরিব মক্কায় অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ বসাচ্ছে। বাংলাদেশেও তেমন কিছু বসাতে হবে। টেলিস্কোপ দিয়ে মানুষই চাঁদ দেখবে। তাই দুইজন মানুষের স্বচক্ষে চাঁদ দেখার ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায়ও সমস্যা হবে না। তবে টেলিস্কোপ বসানোর আগ পর্যন্ত মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ আরো নিখুঁত করতে হবে। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটিকে আরো স্মার্ট ও ডিজিটাল হতে হবে। কোথায়, কবে, কখন চাঁদ উঠবে; সেটা যেহেতু আগেই জানা সম্ভব। তাই সেই এলাকার মানুষের কাছ থেকে চাঁদ দেখার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে আরো নিবিড়ভাবে।

ঈদ হলো আনন্দের। ঈদ নিয়ে আর কোনোদিন বিভ্রান্তি চাই না। এবার মধ্যরাতে ঘোষণা এসেছে। ঈদ হয়ে গেছে বলেই বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। আর যাতে কখনো না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

মধ্যরাতে ঈদের ঘোষণার পর চাঁদ দেখা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক মজা হয়েছে। অনেকে বলেছেন, চাঁদ যানজটে আটকা পড়েছিল। কেউ কেউ বলেছেন, যে দেশে মধ্যরাতে ভোট হয়, সে দেশে চাঁদও মধ্যরাতেই ওঠে। কেউ কেউ বলেছেন, চাঁদ দেখা কমিটি আরেকটু হলে সূর্য দেখে ফেলতো।। তবে আমার এক বন্ধুর দেওয়া জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির নতুন নামটিই বেশি ভালো লেগেছে– জাতীয় চাঁদ দেখা কমেডি। রাত সোয়া ১১টায় ঈদের ঘোষণা আসলে তো জাতির সাথে কমেডিই।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

কমেন্টসমুহ
সিক্রেট ডাইরি সিক্রেট ডাইরি

Top