ওরা বিশ্ব প্রতারক

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাহবুবা আক্তার সুমা (২৬)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তার সঙ্গে পরিচয় হয় ‘আন্দ্রেয়া ফেবিয়ান’ নামে এক বিদেশি নাগরিকের। আন্দ্রেয়া তাকে জানান, তার জন্ম তুরস্কে। তবে চাকরির সূত্রে লন্ডনে রয়েছেন। চাকরি করেন কার্নিভাল ক্রুজলাইনের ডেস্ক অফিসার হিসেবে। ভিনদেশি বলে আন্দ্রেয়ার সংস্কৃতি, আচার-আচরণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সুমা। একপর্যায়ে আন্দ্রেয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তার। এরই মধ্যে তারা দু’জন হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ শুরু করেন। একটি ব্রিটিশ নম্বর (+৪৪৭৪০৪৭০০৩৬৭) থেকে প্রায় নিয়মিত ফোন করতেন আন্দ্রেয়া। একপর্যায়ে তিনি জানান, শিগগিরই ছুটিতে বাংলাদেশে আসছেন তিনি। অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা রয়েছে। পরে আন্দ্রেয়া জানান, সুমাকে কিছু উপহার পাঠাতে চান তিনি। সুমার অনুমতি মেলার পর কুরিয়ারে উপহার পাঠানোর জন্য তার ঠিকানা নেওয়া হয়। পরে আন্দ্রেয়া জানান, উপহারের পাশাপাশি সুমার জন্য কিছু ব্রিটিশ পাউন্ড পাঠিয়েছেন তিনি।

কুরিয়ারের কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কিনা জানতে চান। এরই মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের আরেকটি নম্বর (+৯১৯৬৫০৭০৯৪৮৭) থেকে সুমাকে ফোন করে জানানো হয়- তার জন্য ভারত থেকে একটি পার্সেল এসেছে। এটি ছাড়াতে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স হিসেবে ৭০ হাজার টাকা দিতে হবে। এত টাকা দিয়ে পার্সেলটি ছাড়াতে রাজি ছিলেন না সুমা। তিনি জানান, পার্সেলটি যেন প্রেরকের কাছে ফেরত পাঠানো হয়। তখন সুমাকে জানানো হয়, ফেরত পাঠাতে হলেও সমপরিমাণ টাকা লাগবে। এ বিষয়টি আন্দ্রেয়াকে জানান সুমা। তখন আন্দ্রেয়া বলেন, তিনি চান না কোনোভাবে পার্সেলটি ফেরত আসুক। কারণ তার ভেতরে উপহারের পাশাপাশি ৫৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড রয়েছে। পার্সেলটি রিসিভ করার সিদ্ধান্ত নেন সুমা। এরপর কুরিয়ার কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া একটি বাংলাদেশি ব্যাংকের হিসাব নম্বরে ৭০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন তিনি। কিছু সময় পর তাকে টাকা পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। তখন তারা এও জানায়, স্ক্যানিং করার পর পার্সেলের ভেতরে বেশ কিছু বিদেশি মুদ্রা পাওয়া গেছে। ওই বিদেশি মুদ্রাসহ পার্সেলটি রিসিভ করতে হলে এন্টি মানি লন্ডারিং সার্টিফিকেট নিতে হবে। ওই সার্টিফিকেটের জন্য তারা সুমার কাছে ২৫ লাখ টাকা দাবি করে। এটাও জানানো হয়, ওই অর্থ না দিলে কুরিয়ার সার্ভিস তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করবে। এ বিষয়টি আন্দ্রেয়াকে জানানো হলে সুমির সঙ্গে তিনি রহস্যজনক আচরণ করতে থাকেন। এরপর সুমা নিশ্চিত হন, তিনি প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছেন। প্রতারিত হয়ে সুমা রাজধানীর ভাটারা থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) যা পেয়েছে, তা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে উপহার পাঠানোর কথা বলে গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ব্যাংকের অন্তত ৭০টি হিসাব নম্বর খুলে ৬০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। এখন পর্যন্ত তিন নারীসহ এ চক্রের ১৩ জনের খোঁজ মিলেছে। তাদের একাধিক সদস্য বিদেশি নাগরিক। এরই মধ্যে প্রতারক চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করেছে ডিবি। তারা হলো মোহাম্মদ কাওছার, সাকিবুল হাসান, কাওছার হোসেন, হামিম মোল্লা, মেরাজুল ইসলাম সাগর ও খোরশেদ আলম। তাদের কাছ থেকে ৩০টি ক্রেডিট কার্ড ও নগদ দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। এ চক্রের পলাতক সদস্যরা হলো- শহিদুল, আরমান, হেলাল, রাকিব, জুবায়ের হোসেন রকি, ইসমাইল, ইয়াসমিন প্রমুখ। প্রতারক চক্রের আরেক সদস্য হলো সিমন লুইস বিলি। তিনি জার্মানির নাগরিক বলে পরিচয় দিতেন। লুইসের দাবি, তিনি বর্তমানে লিভারপুলে বসবাস করেন। গোয়েন্দারা বলছেন, প্রতারক চক্রের সদস্য হয়ে তিনি বাংলাদেশি কয়েকজনের সঙ্গে ভিডিও কল করেন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলে তিনি কয়েকজনকে তার ‘অন্তরঙ্গ’ ছবিও শেয়ার করেছেন। লুইসের প্রকৃত নাম-ঠিকানা জানতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে।

প্রতারক চক্রের সদস্য মেরাজুল ইসলাম সাগর জানান, বছর পাঁচেক ধরে তিনি এ প্রতারণায় জড়িত। এই চক্রের প্রধান বিপ্লব লস্কর। তার মাধ্যমে এ পেশায় জড়ান। ৭০টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তারা প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ তুলতেন। মাসে কমপক্ষে এক কোটি টাকা তাদের থাকত। এ হিসাবে পাঁচ বছরে ৬০ কোটি টাকা হাতিয়েছেন। মাস তিনেক আগে বিপ্লবের সঙ্গে তার সর্বশেষ দেখা হয়েছে। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

প্রতারক চক্রের আরেক সদস্য কাওছার হোসেন জানান, কয়েকটি ধাপে ভাগ হয়ে তারা প্রতারণা করতেন। প্রথম ধাপে থাকে কয়েকজন বিদেশি নাগরিক। তারা হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলা ছাড়াও টার্গেট করা ব্যক্তিকে ভিডিও কলও করতেন। দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশি বিপ্লব লস্কর। তৃতীয় ধাপে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন কাওছার। চতুর্থ ধাপে রয়েছেন এরিয়া ম্যানেজার। এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে ছিলেন সাগরসহ তিনজন। পঞ্চম ধাপে ফিল্ড অফিসার। সেখানে রয়েছেন হামিম, সাকিবসহ তিনজন। ষষ্ঠ ধাপে ব্যাংক হিসাবধারী ব্যক্তি। সেখানে অন্তত ১০ জনের ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে। তার মধ্যে কয়েকটি হিসাব নম্বর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের। প্রতারক চক্রের কাছে পাঁচ শতাংশ লাভে ব্যাংক হিসাবধারীরা তাদের অ্যাকাউন্ট ভাড়া দিয়ে আসছিলেন। এক লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে পেলে পাঁচ হাজার টাকা পেতেন ব্যাংক হিসাবধারী। তারা অর্থ তুলে প্রথমে বসুন্ধরা এলাকায় গিয়ে কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের হাতে তুলে দিতেন। এরপর ওই বিদেশি নাগরিকরা বিপ্লব লস্করের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করতেন।

প্রতারক খোরশেদ আলম জানান, প্রতারক চক্রের কয়েকজন একসময় জেলে ছিলেন। সেখানে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়। পরে জেলখানা থেকে বেরিয়ে প্রতারণায় জড়ান তারা।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, প্রতারকরা এতটাই ধূর্ত, কখনও নিজেদের মোবাইল নম্বরে এক টাকা রাখতেন না। যাতে ভুলবশত কারও কাছে কল না যায়। আবার বন্ধ নম্বরে তাদের ফোনকল ডাইভারট করা থাকত। এতে অন্যদের কলও তাদের ফোনে ঢুকত না। তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করেই প্রতারণার ফাঁদ পাতছিল।

ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, ‘প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। এই চক্রের আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অনলাইনে কথোপকথনের মাধ্যমে কেউ উপহার দেওয়ার কথা বললে লোভের বশবর্তী হয়ে সেই ফাঁদে পা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।’

ডিবির উত্তর বিভাগের এডিসি বদরুজ্জামান জিলু বলেন, ‘বিদেশি উপহার পাঠানোর কথা বিশ্বাসযোগ্য করতে কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে অনেকে টার্গেট করা ব্যক্তিদের ফোন দিত। এ চক্রের অনেকে অনর্গল ইংরেজি বলতে পারে। এরা অনেককে নিঃস্ব করেছে।’

প্রতারণার শিকার শ্যামল কুমার সরকার বলেন, ‘সিমন লুইস বিলি নামে একজন বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে ফেসবুকে আমার পরিচয়। এরপর উপহার পাঠানোর কথা বলে সিমন। পরে বুঝতে পারি, তা ছিল প্রতারণার ফাঁদ।’

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Most searched keywords: Insurance, Loans, Mortgage, Attorney, Credit, Lawyer, Donate, Degree, Hosting, Claim, Conference Call, Trading, Software, Recovery, Transfer, Gas/Electricity, Classes, Rehab, Treatment, Cord Blood, domain, music, mobile, phone, buy, sell, classifieds,recipes
Top
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com