তিনি লড়েন ধারাভাষ্যকক্ষে

‘আতহার আলী খান, এ জয় তোমাদের পাওনা’—হাত বাড়িয়ে অভিনন্দন জানালেন সঞ্জয় মাঞ্জেরেকার।
আতহারের মুখে বিকশিত হলো এ বর্ষায় ফোটা কদম ফুলের মতো এক মিষ্টি হাসি। মাশরাফিরা জয় উদ্‌যাপনে মেতেছেন মাঠে। ধারাভাষ্যকক্ষে তৃপ্তির আভা খেলে যাচ্ছে আতহারের চোখেমুখেও।
এই মাঞ্জেরেকার বৃষ্টিবিঘ্নিত ফতুল্লা টেস্টে হালকা একটা খোঁচা দিয়েছিলেন আতহারকে। সেদিন বাংলাদেশ এড়াতে পারল না ফলোঅন। দিনের বাকি সময় ৩০ ওভার খেলতে দ্বিতীয় দফায় নামতে হলো ব্যাটিংয়ে। ওই সময় ধারাভাষ্যকক্ষে আতহার আলী খানকে ৩০ ওভারের চেয়ে কম খেলে টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের অলআউট হওয়ার রেকর্ড মনে করিয়ে দিলেন মাঞ্জেরেকার।
জবাবে আতহার বললেন, ‘এই ২০-২৫ ওভারের মধ্যে এটা হওয়ার তেমন সম্ভাবনা দেখি না।’
সঞ্জয় তখন বললেন, ‘২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ মাত্র ২৬ ওভারেই অলআউট হয়ে গিয়েছিল (১২৪ রানে)।’
সঙ্গে সঙ্গে সঞ্জয়কে আতহার জানিয়ে দিলেন, ‘এটা ২০০৪ নয়, ২০১৫!’ এও বললেন, ‘অল্প কিছুদিন আগেই খুলনা টেস্টে এ দুজনই (তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েস) ৩১২ রানের একটি রেকর্ড-ভাঙা জুটি গড়েছিল।’
ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে আতহার ও শামীম চৌধুরীর সঙ্গে ধারাভাষ্যকক্ষে ছিলেন ভারতীয় তিন ধারাভাষ্যকার মাঞ্জেরেকার, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ ও হার্ষা ভোগলে। তিনজনই ভেবেছিলেন, ভারতের যে ব্যাটিং লাইনআপ, তাতে অনায়াসে তারা টপকে যেতে পারবে ৩০৭ রানের বিরাট বাধা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

২৫তম ওভারে মুস্তাফিজুর রহমানকে মহেন্দ্র সিং ধোনির সেই ধাক্কা প্রসঙ্গেও আলোচনা হলো ধারাভাষ্যকক্ষে। ‘অফ দ্য এয়ারে’ হার্ষা এ ধাক্কাকে ‘ধোনির রাইট’ বলেই অভিহিত করলেন। হার্ষার যুক্তি, ‘বোলার ব্যাটসম্যানের পথে দাঁড়িয়ে ছিল। কাজেই ধোনি তাকে সরিয়ে দিতেই পারে। এটা তার রাইট।’ তখন আতহার বললেন, ‘কিন্তু রিপ্লে দেখে মনে হলো ধোনি ইচ্ছে করেই এমনটা করেছে। এও ঠিক, মুস্তাফিজ ডেঞ্জার জোনে ছিল। তবে ধোনি ওভাবে ধাক্কা না দিলেও পারত।’
বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে সফল হয়েছে চার পেসার খেলিয়ে। ম্যাচের শুরুতে অবশ্য তিন ভারতীয় ধারাভাষ্যকারই মৃদু সমালোচনা করেছিলেন বাংলাদেশের এ পরিকল্পনায়। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, ‘চার পেসারই যখন নিল, তাহলে টসে জিতে ফিল্ডিং নয় কেন? ফর্মে থাকা আরাফাত সানির পক্ষে কথা বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁদের প্রত্যেককেই।’
শেষ পর্যন্ত ওই চার পেসার-পরিকল্পনায় সফল বাংলাদেশ। বেশ দাপটের সঙ্গেই হারাল ভারতকে। আপ্লুত আতহার বললেন, ‘অনেক জয়ই চোখের সামনে দেখেছি। সেগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ধারাভাষ্যজীবনে এটাই আমার দেখা বাংলাদেশের সবচেয়ে সেরা জয়। এমন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন আগ্রাসী ও দাপুটে জয়! অবিশ্বাস্য!’
২০০৫ সালে কার্ডিফে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৫০ রান তাড়া করে জেতার দিন অসম্ভব স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন আতহার। তবে এদিন ভারতের বিপক্ষেই সেই স্নায়ুচাপ খুব একটা ছিল না। কিন্তু কেন? জবাবে বললেন, ‘আমরা তো দাপটের সঙ্গেই জিতেছি। দাপুটে জয়ে টেনশন হবে কেন?’
মাঠে খেলোয়াড়েরা খেলেন, গ্যালারিতে দর্শকেরাও অংশ নেন ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’ হিসেবে। কিন্তু লড়াই চলে আরও এক জায়গায়-ধারাভাষ্যকক্ষে। আতহার এ লড়াই চালাচ্ছেন ১৭ বছর ধরে। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই মিনি বিশ্বকাপ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাভাষ্যের শুরু দেশের হয়ে ১৯ ওয়ানডে খেলা আতহারের। এ দীর্ঘ সময়ে খেলোয়াড় কিংবা দলের বাজে পারফরম্যান্সে শুনতে হয়েছে নানা কটুকাটব্য। তিক্ত সেই অভিজ্ঞতা কষ্ট দিলেও ভেঙে পড়েননি, হতাশায় নুয়ে পড়েননি, ‘ধারাভাষ্যকক্ষে নানা খোঁচা বা তির্যক মন্তব্যে বারবার আমাকে আঘাত করা হয়েছে, কষ্ট দেওয়া হয়েছে। এ দুঃখ-কষ্ট নিয়েই ধারাভাষ্যজীবন শুরু করেছি। তবুও বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, দেশের জন্য বুলেট গায়ে নিয়েছি। এসব মন্তব্য, খোঁচা তো একেকটা বুলেটই! কখনো ভেঙে পড়িনি। বরং এসব আমাকে আরও শক্ত হতে শিখিয়েছে। বিশ্বাস ছিল, একদিন দলটা দাঁড়াবে, ক্রিকেট দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দেবে। গত কয়েক মাসে আমরা সেটাই করেছি।’
ক্রিকেট ছেড়ে ধারাভাষ্যে আসার রেওয়াজ পুরোনো। বাংলাদেশে অবশ্য এটি খুব একটা দেখা যায় না। ক্রিকেট ছেড়ে ধারাভাষ্যে আসা একমাত্র নামটিই আতহার। নিঃসঙ্গ শেরপার মতোই যুক্তি-তর্কে লড়েন ধারাভাষ্যকক্ষে।
২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতকে হারানোর সেই স্মৃতিও আজ দোলা দিচ্ছে আতহারের মনে। ওই ম্যাচেও ধারাভাষ্যকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাঠে। আট বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘কমেন্ট্রি প্যানেলে বসে আছি। জহির খানকে ডাউন দ্য উইকেটে ছক্কা মারল তামিম। ইয়ান বিশপ তো বিশ্বাসই করতে পারছে না! বলে উঠল, “ওয়াও হোয়াট আ টেরিফিক শট, গেট ডাউন দ্য উইকেট এন্ড ডেফিনেটলি সেন্ড দ্য মেসেজ, বাংলাদেশ ক্যান উইন…” ধারাভাষ্যকক্ষে থাকা অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি, ভারতকে হারিয়ে আমরা পরের পর্বে পা রাখছি—আহ্ কী অপার্থিব মুহূর্ত!’
বাংলাদেশ দল সেবার পরের পর্বে গেলেও আতহার কমেন্ট্রি প্যানেলে আর থাকতে পারেননি। দ্বিতীয় পর্বে যেতে পারে, বিশ্বকাপের আগে এমন দলগুলোর ধারাভাষ্যকারদের সঙ্গেই চুক্তি করেছিল সম্প্রচার কর্তৃপক্ষ। সেবার ভারতকে হটিয়ে বাংলাদেশ যে পরের পর্বে যাবে, কেউ কল্পনা করতে পারেনি। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাই আগ থেকে ভারতীয় ধারাভাষ্যকারদের চুক্তি করে রেখেছিল। যদি ভারতীয় কোনো ধারাভাষ্যকার পরের পর্বে ধারাভাষ্য দিতে অনিচ্ছুক থাকতেন, তবেই হয়তো আতহার থাকতে পারতেন। কিন্তু দল পরের পর্বে না গেলেও ভারতের কোনো ধারাভাষ্যকার বিশ্বকাপে ধারাভাষ্য দেওয়ার সুযোগ ছাড়তে চাইলেন না!
মজার ব্যাপার, সেবার একই বিমানে আতহার ও ভারতীয় দল দেশে ফিরছিল। বিমানে ওঠার আগে ভারতীয় অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড় আতহারকে দেখে বেশ অবাক! দ্রাবিড় বললেন, ‘আপনার তো পরের রাউন্ডে যাওয়ার কথা। বাড়ি ফিরছেন কেন?’ কোনো উত্তর দিতে পারেননি আতহার।
ধারাভাষ্যজীবনে উত্তর না দিতে পারার এমন কত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তবুও হতোদ্যম হননি। এগিয়ে গেছেন নতুন প্রেরণায়; কেবল লাল-সবুজের জয়গান গাইবেন বলে।
আরও একটি সুযোগ সামনে। আজ ধোনিদের হারিয়ে দিলেই সিরিজ জিতে যাবেন মাশরাফিরা। এরপর বাকি থাকবে শেষ ম্যাচ। সেটিতেও জিতলেই আতহার উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বলে উঠবেন—ইটস কলড বাংলাওয়াশ! বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত তখন প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে—বাংলাওয়াশ! বাংলাওয়াশ!

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Most searched keywords: Insurance, Loans, Mortgage, Attorney, Credit, Lawyer, Donate, Degree, Hosting, Claim, Conference Call, Trading, Software, Recovery, Transfer, Gas/Electricity, Classes, Rehab, Treatment, Cord Blood, domain, music, mobile, phone, buy, sell, classifieds,recipes
Top