তিনি উত্তম

তার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বহুদিন পর মনে পড়ল, গেল আগস্টের শেষদিকে একদিন আহমেদ স্বপন মাহমুদের ‘হারানো ফোন এবং একজন সাহিদ হাসান’ পড়ার পর। স্বপন মাহমুদের হারানো ফোনটি ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহিদ হাসান বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি সেই ঘটনাটির কথা জানাতে বেশ আবেগ-আপ্লুত স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ফেসবুকে। আমিও একাধিকবার মোবাইল ফোন হারিয়ে ফেরত পেয়েছি, তবে প্রথম মোবাইল ফোনটি প্রথমবার হারিয়ে ফেরত পাওয়ার গল্পটি এখনও ভুলতে পারিনি। হারানো জিনিস ফেরত পাওয়ার মধ্যে আনন্দ আছে। তবে আমার ওই ফোনটি ফেরত পাওয়ার গল্পটা শুধু আনন্দের নয় এবং যদি শুধুই আনন্দের হতো তাহলে প্রায় দুই দশক আগের ওই ঘটনাটি নিশ্চয়ই ভুলে যেতাম। কিন্তু রহিম নামের যে রিকশাচালক আমাকে ফোনটি ফিরিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, যার নিজের উচ্চারণে তিনি অহিম, সেই অহিম আমাকে এমন এক শিক্ষা দিয়ে গেছেন, যা আমি কোনোদিনই ভুলতে পারব না। রহিম আমাকে জানিয়ে দিয়ে গেছেন, আমি অধম হলেও তিনি উত্তম।

তখনও ঢাকার রাস্তায় রিকশা চলাচলের ওপর এত সব নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়নি। আমার অফিস ছিল কারওয়ান বাজারে। সেটা সম্ভবত ২০০০ সালের কোনো এক শীত সন্ধ্যার ঘটনা। তখনও আমি সংস্কৃতি-বিষয়ক রিপোর্ট করি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো সাধারণত সন্ধ্যায় হয়। আমি যে কাগজটিতে কাজ করতাম, সেখানে তখন পর্যন্ত ছোট ছোট সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও অনেক গুরুত্বের হয়ে উঠত। পত্রিকাটি দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেও সেই সময় পর্যন্ত এটির প্রচার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই ছিল সর্বাধিক।

আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন পর্যন্ত রিপোর্টারদের মধ্যে সকালে অফিসে যাওয়ার চর্চা ছিল না বললেই চলে। এখন কেউ কেউ সকালে অফিসে এলেও সাধারণত বিকেলেই অফিসে রিপোর্টারদের সমাগম ঘটে। রাতে অফিস ছাড়ার আগে আমরা পরের দিন যার যা কাজ তা জেনে যেতাম। কারণ অনেকেরই মোবাইল ফোন ছিল না। মোবাইল ফোন বস্তুটা তখনও বেশ দুর্লভ বস্তু। রিপোর্টারদের যাদের মোবাইল নেই, অফিস থেকে তাদের মোবাইল নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া শুরু হয়। আমি এখনও ডিজিটাল দুনিয়ার অ্যানালগ মানুষদের একজন। হাতে মোবাইল ফোন ছিল ডিজিটাল পৃথিবীতে প্রবেশের প্রথম ধাপ। আমিও এখন মোবাইল ছাড়া নিজেকে ভাবতে পারি না। তবে প্রথম ফোনটা নেওয়ার সময় যতটা দেরি করা সম্ভব, তাই করার চেষ্টা করেছি। অফিসের চাপেই প্রথম মোবাইল কিনেছিলাম। দীর্ঘসূত্রতার কারণ মোবাইল নেওয়া মানেই অফিসের হাতের মুঠোয় ঢুকে যাওয়া। অফিসের কর্তাব্যক্তিরা এই গড়িমসির কারণ বুঝতে অপারগ হবেন, এমনটা ভাবার কারণ নেই। চিফ রিপোর্টার, নিউজ এডিটর তাই নিত্যদিন জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন মোবাইল কিনছ না?’ ঝুলিয়ে রাখার জন্য এবার আর্থিক অসঙ্গতির অজুহাত তুলি। তখন সবচেয়ে কম দামি মোবাইলেরও দাম পনের-বিশ হাজার টাকা। অবশেষে অফিস বেতন থেকে মাসে পরিশোধযোগ্য আগাম বরাদ্দ করলে মোবাইল কিনতে বাধ্য হই। গল্পের এই অংশটা উত্তম মানুষ রহিমের গল্পের সঙ্গে খুব প্রাসঙ্গিক কিছু নয়।

অফিসের দেওয়া আগাম টাকায় কেনা মোবাইল সঙ্গে নিয়ে ঘুরি। তবে কাউকে নাম্বার দেওয়া তো দূরের কথা, নিজে যে একটা মোবাইল ফোনের গর্বিত মালিক, তা-ও জানতে দিই না কাউকে। তখন মোবাইলে ইনকামিং ফোনের জন্যও টাকা কাটা হতো, কাউকে নাম্বার না দেওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে। অবশ্য আমাদের মতো মোবাইলবিহীন প্রজন্মকে মোবাইলে অভ্যস্ত হওয়ারও কসরত করতে হয়েছে। ফলে মোবাইলের কথা ভুলে যাই এবং এখানে-ওখানে ফেলে রেখে আসার ঘটিয়েছি অনেকবার। হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন।

হারানো জিনিস ফিরিয়ে দেওয়া অনেক মানুষের মধ্যে রহিম এখনও আমার স্মৃতিতে ভাস্বর। ২০০০ সালের দিকে কোনো শীত সন্ধ্যায়, অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে শিল্পকলা একাডেমি থেকে রিকশায় মগবাজার হয়ে এফডিসির সামনে দিয়ে কারওয়ান বাজারে এসে অফিসের নিচে নামলাম। আমার ওই অফিসের নিচের রাস্তার দুদিকে তখনও এত মোটরসাইকেল ও গাড়ি অপেক্ষায় থাকত না। অফিস থেকে এই সব বাহন দেওয়া শুরু হয়েছে, এরও দু-এক বছর পর। অফিসের নিচে দু’দিকেই ছিল কিছু চায়ের দোকান। দোকানদাররা ছিলেন আমাদের ঘনিষ্ঠ, কারণ আমরা অনেকেই ছিলাম তাদের বাইক্যা কাস্টমার। পুরো মাস আমাদের কারও কারও নাম খাতায় লিখতে হতো তাদের এবং মাস শেষে বেতন পেলে বিল পরিশোধ করতাম আমরা। বাইক্যা কাস্টমার ও আমরা, দু’পক্ষই পরস্পরের মামা। রিকশা থেকে নেমে আমি এমন একজন মামার কাছে গেলাম চা-বিড়ি খেতে। তারপর অফিসে গিয়ে মাত্র লিখতে বসেছি, তখন রিসিপশন থেকে ডাক এলো, ‘আপনার গেস্ট আছে।’ বিরক্তি নিয়ে রিসিপশনে গিয়ে দেখি, নিচের চা-ওয়ালা মামার সঙ্গে একটু আগে যার রিকশায় এসেছি সেই রিকশাওয়ালা। রিকশাওয়ালা আমার হাতে আমার মোবাইলটা ফিরিয়ে দিলেন।

পকেটে টাকা-পয়সা এখনও থাকে না, তখন একেবারেই থাকত না। তাই রিকশাওয়ালাকে একটু বসতে বলে ভেতরে গিয়ে সহকর্মীদের কারও একজনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার করে এনে রিকশাওয়ালাকে দিতে চাইলাম। ভদ্রলোক আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘এইগুলা কইরা আপনেরা গরিবের স্বভাব নষ্ট করেন। আপনে আপনের টাকা রাখেন, আমার বকশিশ লাগব না।’ আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি যে, আমি খুশি হয়ে তাকে টাকাটা দিচ্ছি। তিনি পাল্টা জানতে চান, আমি কেন খুশি হবো, উনি তো আমার জিনিস আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। নিজের কিছু দেননি। যদিও হাতের কাজটা শেষ করা খুব জরুরি ছিল, সাধারণের চেয়ে ভিন্নতর এই মানুষটির সঙ্গে আমি নিচে নামলাম। তাকে চা-সিগারেট খাওয়ালাম। চা খেতে খেতে তিনি জানালেন, এই দোকানটিতে নামতে দেখেছিলেন বলেই তার পক্ষে আমাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বয়সে আমার কাছাকাছিই হবেন, রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকার মানুষটি কথা বলেন ঢাকায় প্রচলিত শুদ্ধ বাংলায়। শুধু রংপুর এবং নিজের নাম রহিম বলতে গিয়েই বিপত্তি ঘটান। তার নাম কেন রহিম রাখা হয়েছে সেই ইতিহাস বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘অংপুরের লোকজন মনে করে তাদের পোলাপান সবাই অহিমউদ্দিন ভরসার মতন শূন্য থেকে ধনি হইয়া যাইব।’ মনে আছে রহিমের সঙ্গে আমার বেগম রোকেয়া নিয়েও আলাপ হয়েছিল। কাজের তাড়া থাকার কারণে গল্প দীর্ঘ করতে পারিনি। আমি তাকে আমার ভিজিটিং কার্ড দিলাম, তখনও লোকজন ভিজিটিং কার্ডে মোবাইল নাম্বার ছাপাত না। আমি নিজের হাতে কার্ডে মোবাইল নাম্বার লিখে দিলাম। বললাম, ‘আবার আসবেন। কোনো প্রয়োজন হলে জানাবেন।’

গল্পটা এখানে শেষ হলেই ভালো হতো। হয়নি, কারণ কিছুদিন পর তার কথা মনে হলে আমি রিকশাওয়ালাদের মধ্যে তার মুখ খুঁজতে শুরু করি। আসলে ঘটনাটি যখন ঘটছে, তখন আমি তাকে ভালো করে দেখিইনি। আমি হয়তো ভেবেছিলাম এই রিকশাওয়ালাটা অন্যদের থেকে শিক্ষিত। তাই সাংবাদিকের সামাজিক গুরুত্ব বুঝতে পেরে বেশি নীতি-নৈতিকতা দেখিয়েছে। আদৌ এই সব ভেবেছিলাম কি-না তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। হয়তো আমার অবচেতন মনে এমন ভাবনাই ছিল; আমি হয়তো ভেবেছিলাম, ওই রিকশাওয়ালা আবার আসবেন আমার কাছে। নিশ্চয়ই কোনো উপকার চাইবেন। যদি তিনি আসতেন, আমি তার জন্য কিছু করতে পারলে করে দিতাম। রহিম কোনোদিনই আর আসেননি। ফোন করেননি। মাসখানেক পর হঠাৎ করেই তার কথা মনে হলো। আমি রিকশাওয়ালাদের ভিড়ে তাকে খুঁজতে শুরু করি। পাইনি। হয়তো আমি তাকে দেখেছি, চিনতে পারিনি। রহিম যেমন মানুষ তার এসে যেচে বলার কথা না, আমি সেই লোক যে আপনার হারানো মোবাইল ফেরত দিয়ে এসেছিলাম। এখন আর তাকে খুঁজি না। বহুকাল পর তার কথা আবার মনে পড়ায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের একটি বাক্য একটু ঘুরিয়ে নিজেকেই বললাম, ‘আমি অধম- তাই বলিয়া তিনি উত্তম না হইবেন কেন?’

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Most searched keywords: Insurance, Loans, Mortgage, Attorney, Credit, Lawyer, Donate, Degree, Hosting, Claim, Conference Call, Trading, Software, Recovery, Transfer, Gas/Electricity, Classes, Rehab, Treatment, Cord Blood, domain, music, mobile, phone, buy, sell, classifieds,recipes
Top
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com